পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর নতুন রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলীয় প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অন্তত ১৯ জন সাংসদ বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের (এনডিএ) জোটের সঙ্গে থাকতে আগ্রহী বলে দাবি করেছে ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।
আজ (শুক্রবার) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এনডিটিভি জানায়, তাদের হাতে আসা একটি চিঠিতে তৃণমূল কংগ্রেসের ১৯ জন সাংসদের স্বাক্ষর রয়েছে। ওই চিঠিতে সাংসদরা দল থেকে পৃথক অবস্থান নেওয়ার ইচ্ছা এবং এনডিএর সঙ্গে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে তৃণমূলের পরিচিত মুখ কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায়, সায়নী ঘোষ ও ইউসুফ পাঠানের নাম রয়েছে। দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমটি আরও দাবি করেছে, শিগগিরই আরও একজন প্রভাবশালী নেতা বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিতে পারেন।
জানা গেছে, গত ১৮ মে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বিদ্রোহী সাংসদরা নিজেদের পৃথক অবস্থানের বিষয়টি তুলে ধরেন। এর দুই দিন পর তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে স্পিকারের কাছে আরেকটি চিঠি পাঠিয়ে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের পরিবর্তে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের প্রধান হুইপ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
এর আগে কাকলি ঘোষ দস্তিদারও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, তৃণমূলের একটি অংশ দল ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও তখন তিনি কোনো নাম প্রকাশ করেননি, তবে সংসদে আলাদা বসার ব্যবস্থা চাওয়া এবং বিজেপির প্রতি সমর্থনের বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন।
এদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের তিনজন সাংসদ ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। বৃহস্পতিবার রাজ্যসভার সদস্যপদ ছাড়েন প্রকাশ বারাইক। এর আগে ১০ জুন পদত্যাগ করেন সুশ্মিতা দেব এবং ৮ জুন পদ ছাড়েন সুখেন্দু রায়। তবে তারা বিদ্রোহী সাংসদদের চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বর্তমানে লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের ২৮ জন সাংসদ রয়েছেন। ভারতের দলত্যাগবিরোধী আইন অনুযায়ী, পৃথক গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি পেতে কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদের সমর্থন প্রয়োজন। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, তাদের কাছে সেই সংখ্যাটি রয়েছে।
অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ নেতা কীর্তি আজাদ অভিযোগ করেছেন, বিজেপির চাপ ও প্রলোভনের মাধ্যমে কয়েকজন সাংসদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। বিজেপির কথিত ‘অপারেশন লোটাস’-এর সমালোচনা করে তিনি বলেন, যারা দল ছাড়তে চান তারা যেতে পারেন, তবে তারা প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করবেন না।
দলটির অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের পেছনে নেতৃত্বের ধরন, দুর্নীতির অভিযোগ এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়গুলোকে দায়ী করা হচ্ছে। চারবারের সাংসদ শতাব্দী রায় অভিযোগ করেছেন, দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের মতামতের যথাযথ মূল্যায়ন করা হতো না এবং সীমিত কয়েকজন নেতারই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে সরাসরি যাওয়ার সুযোগ ছিল।
তৃণমূল কংগ্রেসের এই সংকট পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে বিদ্রোহী সাংসদদের ভবিষ্যৎ অবস্থান এবং স্পিকারের সিদ্ধান্তের ওপরই পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করবে।