তৃতীয় দিনে হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ, যা জানা গেল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ৯, ২০২৩, ০৭:৫৪ পিএম

তৃতীয় দিনে হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ, যা জানা গেল

সংগৃহীত ছবি

যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ সশস্ত্র সংগঠন হামাসের হাতে। ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী এই সংগঠনটির সাথে ইসরায়েলের প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ লেগেই থাকে। সচরাচর দেখা যায় ইসরায়েলের আক্রমণের প্রতি আক্রমণ হিসেবে হামাস সংঘর্ষে জড়ায়। কিন্তু গত শনিবার (৭ অক্টোবর) আকস্মিকভাবে ইসরায়েলে নজিরবিহীন হামলা শুরু করে হামাস। শনিবার ভোর থেকে স্থল, জল ও আকাশপথে সমন্বিত হামলা করে তারা। জবাবে ইসরায়েলি সেনারাও নির্বিচারে হামলা চালায় ফিলিস্তিনে। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এটাকে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

সোমবার (৯ অক্টোবর) হামাস ও ইসরায়েল মধ্যে চলমান যুদ্ধের তৃতীয় দিন। এই যুদ্ধে আজ সোমবার পর্যন্ত যা ঘটেছে এবং ঘটছে তার কিছু সারসংক্ষেপ প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।

যুদ্ধের তৃতীয় দিনে এসে ফিলিস্তিনের দক্ষিণাঞ্চলে হামাস যোদ্ধাদের সঙ্গে ইসরায়েলি সেনাদের গোলাগুলি চলছে। এর মধ্যে কারমিয়ার কিববুৎজ এবং আশকেলন শহর ও সেদরতে ব্যাপক গোলাগুলির খবর পাওয়া গেছে। হামাসের শীর্ষ এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গাজায় তারা একশর বেশি ইসরায়েলিকে বন্দী করে রেখেছে। মুসা আবু মারজুক নামে হামাসের শীর্ষ এক কর্মকর্তা আরবি সংবাদমাধ্যম আলগহাদকে জানিয়েছেন, এসব বন্দীর মধ্যে ইসরায়েলের শীর্ষ কর্মকর্তাও রয়েছেন।

হামাসের আক্রমণের শুরুতে মোকাবিলায় ব্যর্থ হওয়া ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দেশটির বাসিন্দাদের সমালোচনার মুখে পড়েছে। যদিও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলছে, তাঁর দেশ গাজা উপত্যকার কাছে এক লাখের মতো অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে। তারা গাজা সীমান্তবর্তী বেশির ভাগ এলাকার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে। তাদের হামলায় কয়েক শ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। তাদের হাতে অনেক ফিলিস্তনি আটকও হয়েছে। 

এই হামলার পিছনে মদদকারী হিসেবে ইরানকে দায়ী করছে পশ্চিমা বিশ্ব। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলে এমন আকস্মিক হামলায় ইরানের পক্ষ থেকে হামাসকে সহযোগিতা করা হয়েছে। কিন্তু এই দাবিকে নাকচ করে দিয়ে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানি মিশন বলছে, এই হামলার সঙ্গে তেহরান জড়িত ছিল না।

ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে আমরা দৃঢ়ভাবে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু আমরা ফিলিস্তিনিদের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত নই, ফিলিস্তিন এককভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে বলে এক বিবৃতে জানিয়েছে ইরান।
এ যুদ্ধের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ একটি জরুরি বৈঠকে বসেছিল। কিন্তু বৈঠকটি ফলপ্রসূ হয়নি। বৈঠকের পর জাতিসংঘের পক্ষ থেকে যৌথ কোনো বিবৃতিও দেওয়া হয়নি।

হামাসের আকস্মিক হামলার পর ইসরায়েলকে সমর্থন প্রদর্শনের অংশ হিসেবে ইসরায়েলের কাছাকাছি তাদের একাধিক সামরিক জাহাজ ও যুদ্ধবিমান পাঠানোর সিদ্বান্ত নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

জাতিসংঘে ফিলিস্তিনি মিশন একটি বিবৃতি প্রকাশ করে বলছে যে ‘এমন পরিস্থিতি হুট করে ঘটেনি। এই বছর শত শত ফিলিস্তিনিকে হত্যার ফল এটি’।

এদিকে হামাসের হামলার জবাবে গতকাল রোববার গাজায় বিভিন্ন বাসস্থান, টানেল, মসজিদ ও হামাসের কর্মকর্তাদের বাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। এতে এ পর্যন্ত ২০ শিশুসহ ৪০০ জনেরও বেশি নিহত হয়েছে। 

জাতিসংঘের তথ্যমতে, ভবন ও অ্যাপার্টমেন্ট লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বিমান হামলা এবং গোলাবর্ষণের ফলে গাজায় প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৫৩৮ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

হামাস দাবি করছে তাদের আকস্মিক হামলায় প্রায় ৭০০ ইসরায়েলি নিহত হয়েছে। এ সময় তারা অনেক ইসরায়েলিকে অপহরণ করেছে বলেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বলা হয়।

এ যুদ্ধে থাইল্যান্ডের ১২ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৪ জন এবং ফ্রান্সের ১ জন নাগরিক নিহত হয়েছে বলে দেশগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়।

এরই মাঝে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এ যুদ্ধের ফলে এশিয়ার জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি তিন ডলার বেড়েছে আজ। তেলের সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বিনিয়োগকারী ও বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা বলেছেন, ইসরায়েলে অবস্থান করা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নানা রকমের বাধার সম্মুখীন হতে পারে আশঙ্কা প্রকাশ করে তাদের নিরাপত্তা জোরদার করার দাবি জানিয়েছে। ইতিমধ্যে নিরাপত্তাজনিত কারণে এশিয়ার অনেক দেশ ইসরায়েলে তাদের ফ্লাইটও বাতিল করেছে।

হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও। গতকাল তারা ইসরায়েলে সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। জবাবে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলও। ইসরায়েলি সেনাদের দাবি, লেবাননের ওই এলাকা থেকে তাদের একটি সেনা স্থাপনা লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছিল। তারাও লেবাননে গোলাবর্ষণ করেছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলছে, তাদের একটি ড্রোন লেবাননের সীমান্তবর্তী মাউন্ট ডভ এলাকায় ‘একটি হিজবুল্লাহ অবকাঠামোয়’ আঘাত করেছে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স প্ল্যাটফর্মে তারা এ কথা বলে।

ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম হারেৎজের ভাষ্যমতে, হিজবুল্লাহ যদি হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তাহলে ইসরায়েল বিপাকে পড়বে। ইসরায়েলি স্থাপনা লক্ষ্য করে হিজবুল্লাহর হামলার প্রতিক্রিয়ায় কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে হারেৎজের সাংবাদিক জিডিওন লেভি বলেন, ‘আমরা একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হব, যদি ইসরায়েলকে দুটি ফ্রন্টে লড়াই করতে হয়। এবং সম্ভবত তিনটি, যদি অধিকৃত পশ্চিম তীরও দৃশ্যপটে চলে আসে। এটি একটি নতুন “খেলা” এবং ইসরায়েল এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে, যা এর আগে কখনো হয়নি।’ 

ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় হামলা চালালে এই সংঘর্ষ অন্য দিকে মোড় নেবে। হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধে জড়িয়ে ‘হিজবুল্লাহ’ ইসরায়েলিদের কাছে এমন একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়।

Link copied!