ইউক্রেনেই কি ডার্টি বোমার ব্যবহার হতে যাচ্ছে?

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

নভেম্বর ৩, ২০২২, ১০:৪৫ পিএম

ইউক্রেনেই কি ডার্টি বোমার ব্যবহার হতে যাচ্ছে?

ইউক্রেন যুদ্ধে গত কয়েক মাস ধরে ডার্টি বোমার ব্যবহার নিয়ে খুব আলোচনা হচ্ছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন পাল্টাপাল্টি অভিযোগও করছে ওই বোমার ব্যবহার নিয়ে। ইউক্রেন বলছে, যুদ্ধে না পেরে রাশিয়া শীতের আগে ডার্টি বোমার ব্যবহার করার পরিকল্পনা আঁটছে। রাশিয়াও পাল্টা বলছে, যেহেতু ইউক্রেন এমন অভিযোগ তুলছে, সুতরাং তাঁরাই ওই বোমা মেরে রাশিয়ার ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করবে।

আলোচিত এই ডার্টি বোমা আসলে কী? ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পরই বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জোর গুঞ্জন উঠে। এই গুঞ্জন এখন ডালপালা মেলেছে অনেক দূর।

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। ইউক্রেনের চার অঞ্চলের রুশভাষী নাগরিকদের রক্ষা এবং ন্যাটোর প্রভাব বলয় থেকে ইউক্রেনকে দূরে রাখতে দেশটিতে হামলা চালায় রাশিয়ার সেনাবাহিনী। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। বিশ্ববাসী এরমধ্যেই দেখেছে দুই পক্ষ নতুন নতুন মারণাস্ত্রের ব্যবহার করছে।  ক্লাস্টার বোমা, থারমোব্যারিক বোমা কিংবা ট্যাকটিক্যালের মত পারমাণবিক বোমার ব্যবহারও নতুনভাবে দেখেছে বিশ্ব। সম্প্রতি ডার্টি বোমার নামও উচ্চারিত হচ্ছে জোরেশোরে।

বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে খেরসনসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলে রুশ বাহিনী বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। তাঁদের দখল করা কয়েক শ বর্গমাইল এলাকা পুনর্দখলে নেয় ইউক্রেন। এ অবস্থায় যুদ্ধের মোড় ঘুরাতে কিয়েভসহ সারাদেশে একযোগে মিসাইল হামলা চালায় রুশ বাহিনী।

রাশিয়া ভালভাবে জানে, তাদের মিসাইল হামলার পাল্টা জবাব দেবে ইউক্রেন। ওয়াশিংটনের কাছ থেকে তাই কিয়েভ ডার্টি বোমা সংগ্রহ করে। এ কারণে রুশ সেনাদের মাঝে আতঙ্কও ছড়ায়। তাদের ধারণা, প্রতিশোধ নিতে হয়তো কিয়েভ এবার রুশ সেনাদের লক্ষ্য করে ডার্টি বোমা ছুড়বে।

এই যে ডার্টি বোমা নিয়ে এত আলাপ-উত্তেজনা, এই ডার্টি বোমা আসলে কী? নামের মতো কতোটা মন্দ বা নোংরা এই বোমা? কতটুকু ধংসের ক্ষমতা আছে এই বোমার?

বোমার জগতে একেবারেই নতুন এক ধারনা এই ডার্টি বোমা। প্রযুক্তিগতভাবে ‘রেডিওলজিক্যাল ডিসপারসাল ডিভাইস’ হিসাবে পরিচিত এটি। এই বোমায় বিস্ফোরক হিসেবে থাকে ইউরেনিয়ামের মতো বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থ থাকে। তবে কম মাত্রায়। গঠনগত দিক থেকে এটি সাধারণ টিএনটি বোমার মতোই।

দূষণ এবং তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই মূলতঃ এই বোমা ব্যবহার করা হয়। আর যদি তেজস্ক্রিয় কণাগুলো খুব সূক্ষ্ম হয় এবং তা প্রবল বাতাসে ছড়িয়ে যায়, তবে তা আরও বেশি ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ ধরনের বোমা বেসামরিক নাগরিকদের জন্য বিপজ্জনক।

এই বোমা মূলত প্রচলিত বিস্ফোরক যেমন ডিনামাইটের সাথে এক বা একাধিক তেজস্ক্রিয় পদার্থ মিশিয়ে তৈরি করা হয়। রেডিওঅ্যাকটিভ পাউডার বা পিলেটকে ডিনামাইটের সাথে মিশিয়ে ডার্টি বোমা তৈরি করা হয়। সাথে হাসপাতাল বজ্র বা সরঞ্জাম। যেহেতু বিস্ফোরিত এলাকা দ্রুত দূষিত করে ফেলার ক্ষমতা রাখে এই বোম, সে কারণে এই বোমাকে বলা হচ্ছে ডার্টি বোমা।

পারমাণবিক বোমা তৈরিতে তেজস্ক্রিয় উপাদান যে উচ্চমাত্রায় পরিশোধন করা হয় ডার্টি বোমার ক্ষেত্রে তেমনটি করা হয় না। কম মাত্রায় পরিশোধিত যেমন: হাসপাতাল, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা গবেষণা পরীক্ষাগারে ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় উপাদান যে মাত্রায় পরিশোধন করা হয় ডার্টি বোমার ক্ষেত্রেও এই মাত্রা একই।

তবে পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়ে এটি কম খরচে ও কম সময়ে তৈরি করা যায়। এটি গাড়িতে করে বহন করা যায়। এ ধরনের তেজস্ক্রিয় বোমার বিস্ফোরণের প্রভাবে ক্যানসারের মতো গুরুতর শারীরিক সমস্যা হতে পারে।

বেসরকারি বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থা ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্ট বলছে, নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে যদি ৯ গ্রাম কোবাল্ট-৬০ এবং ৫ কেজি টিএনটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, তাহলে পুরো শহর কয়েক দশকের জন্য বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডার্টি বোমা একটি মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র এবং কাউকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করলে এই ধরণের অস্ত্র ব্যবহার কাজে লাগে। এই বোমা বিস্ফোরিত হলে তাঁর তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা এবং ধোঁয়া অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিস্ফোরণের কেন্দ্রস্থল বা তাঁর আশপাশে নিঃশ্বাস নেওয়া হলেও তা হবে বিপজ্জনক।

বিশ্বে এ পর্যন্ত ডার্টি বোমা ব্যবহারের নজির নেই। যদিও বিশ্বে কয়েকবার ডার্টি বোমা ব্যবহারের চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু সেসব উদ্যোগ সফল হয়নি। ১৯৯৮ সালে চেচনিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা রেললাইনের কাছে স্থাপন করা একটি ডার্টি বোমার সন্ধান পায়। পরে ওই বোমাটি নিষ্ক্রিয় করা হয়। ইউক্রেনে এই বোমার ব্যবহার হয় কিনা, এখন তা নিয়েই বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ শংকায় আছে।

Link copied!