শান্তির নোবেল নিয়ে যত ‘অশান্তি’

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

অক্টোবর ৫, ২০২২, ০৭:২৩ পিএম

শান্তির নোবেল নিয়ে যত ‘অশান্তি’

ডিনামাইটের আবিষ্কারক বিখ্যাত সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল কর্তৃক প্রবর্তিত নোবেল পুরষ্কারের ছয়টি বিভাগের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার। ১৯০১ সালে প্রবর্তন করা নোবেল পুরষ্কারের অন্যান্য বিভাগগুলো হলো- রসায়ন বিজ্ঞান, পদার্থ বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও সাহিত্য । প্রতি বছর নোবেল শান্তি পুরষ্কার ছাড়া সব বিভাগের পুরষ্কার সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে দেওয়া হয়।

নোবেল শান্তি পুরষ্কারের জন্য প্রার্থী মনোনয়ন, যাচাই-বাছাই, চূড়ান্ত নির্বাচন,আনুষ্ঠানিকভাবে নোবেল শান্তি পুরষ্কার  দেওয়ার সবকিছু করে থাকে নরওয়ে। এই পুরষ্কার যিনি পাবেন তাকে বাছাই করতে নরওয়ের পার্লামেন্টের পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি জুরি কমিটি গঠন করা হয়। পার্লামেন্ট অনুমাদিত  এই জুরি কমিটির সদস্যরা নোবেল শান্তি পুরষ্কারের গ্রহীতা নির্বাচন করে থাকেন । প্রতি বছরের ১০ ডিসেম্বর দেশটির রাজধানী অসলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হয় নোবেল শান্তি পুরষ্কার।

নোবেল শান্তি পুরষ্কার নিয়ে অশান্তির শুরু সেই গোড়া থেকেই। নোবেল কমিটির অদূরদর্শীতা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত একদিকে যেমন হেনরি কিসিঞ্জারসহ অনেক বিতর্কিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছে। অন্যদিকে, মহাত্মা গান্ধীর মতো অনেক যোগ্য ব্যক্তিত্ব এই পুরষ্কার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।  নোবেল শান্তি পুরষ্কার ইস্যুতে স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য, লবিং, আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপে সাড়া দেওয়াসহ নোবেল কমিটির বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ রয়েছে।

১৯৭৩ সালের ঘটনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভিয়েতনামের যুদ্ধ চলছে। ওইসময় তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ও উত্তর ভিয়েতনামের বিপ্লবী নেতা লি ডুর থো যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরষ্কার লাভ করেন। এ ঘটনায় নোবেল পুরষ্কার কমিটির বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

সমালোচনার ঝড় ওঠার অন্যতম কারণ হলো- তখন ভিয়েতনামের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বিরতি চললেও হেনরি কিসিঞ্জার অনেকটা কৌশলে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে একের পর এক বোমা ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এতে ভিয়েতনামের হাজারো মানুষ হতাহত হয়। এজন্য কিসিঞ্জারের শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্তির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিতর্কের ঝড় উঠে।

তখন বিখ্যাত মার্কিন গণমাধ্যম 'নিউ ইয়র্ক টাইমস' কিসিঞ্জারের নোবেল প্রাপ্তীকে 'নোবেল ওয়ার প্রাইজ' বলে সমালোচনা করেছিল। শুধু তাই নয় মার্কিন কূটনীতিবিদ জর্জ বোল 'ওয়াশিংটন পোস্ট' পত্রিকায় লিখেছিলেন, ‘নরওয়ের নাগরিকদের অবশ্যই কাণ্ডজ্ঞান থাকাটা জরুরী।’ ভিয়েতনামের বিপ্লবী নেতাও কিসিঞ্জারের সাথে যৌথভাবে নোবলে শান্তি পুরষ্কার নিতে অস্বীকৃতি জানান ওই সময়।

ভিয়েতনাম প্রসঙ্গে তখন লি ডুর থো বলেছিলেন, “এখনো শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।” আর এই কারণে তিনি শান্তি পুরস্কার নেওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। তার এই সিদ্ধান্তে নোবেল কমিটির দুজন সদস্য পদত্যাগ করেন।

বারাক ওবামা ২০০৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসার মাত্র নয় মাসের মাথায় নোবেল শান্তি পুরষ্কারের জন্য মনোনীত হন। সামান্য সময়ে শান্তির জন্য তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অবদান তার না থাকায় নোবেল কমিটির এ সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।  নোবেল শান্তি পুরষ্কার পাওয়ায় ওবামা নিজেও বিস্মিত হয়েছিলেন ।ওবামার অনেক সমর্থকও নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তকে ‘ ভুল’ বলে সমালোচনা করেন।

মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী হিসেবে পরিচিত অং সান সু চি’র বিষয়টি অবশ্য ভিন্ন ধরণের। জান্তা সরকারের আমলে দীর্ঘদিন বন্দি থাকাবস্থায় ১৯৯১ সালে তাকে নোবেল শান্তি পুরষ্কার দেওয়া হয়। দীর্ঘ কারাবাস ও নির্যাতিত মানুষের নেত্রী হিসাবে তাঁর এ অর্জনকে সাধুবাদ জানায় বিশ্ব সম্প্রদায়। তবে ২০১১ সালে তার নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল মিয়ানমারে ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড বিশেষ করে রোহিঙ্গা নিধনে তার নীরব ভূমিকার জন্য প্রচণ্ড সমালোচিত হন। জাতিসংঘসহ বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলো তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও অসন্তোষ জানায়। এমনকি  তার নোবেল শান্তি বাতিলের জন্য রাস্তায় নেমে আসে হাজারো গণতন্ত্রকামী মানুষ।



ড. মোহাম্মদ ইউনুস এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পায়। বিশ্বব্যাপী 'ক্ষুদ্রঋণ' ধারণার পরবর্তনের জন্য তিনি এই পুরস্কার পান বলে নোবেল কমিটি জানায়। ড. ইউনুসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক উচ্চ সুদে দরিদ্র মানুষদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে এই ঋণের কর্মসূচি চালু করে। এই হিসেবে ড. ইউনুস সফলতার জন্য অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেতে পারতেন। তখন প্রশ্নে ওঠে-ড. ইউনুস শান্তিতে কেন নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন?  আরও প্রশ্ন ওঠে-নরওয়ের টেলিনোর কোম্পানী বাংলাদেশের গ্রামীণ ফোনের বিলিয়ন ডলারের ব্যবসার পার্টনার করার পুরস্কার কি এই নোবেল শান্তি?

আবার সবচেয়ে কম বয়সে শিশু অধিকারকর্মী মালালা ইউসুফজাই নোবেল শান্তি পুরষ্কার লাভ করেন। ২০১৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি এ পুরস্কারে ভূষিত হন। মালালার অবদান ও যোগ্যতা নিয়ে তখন প্রশ্ন ওঠে। মালালা পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকায় তালেবানের নির্দেশ অমান্য করে স্কুলে যেতেন এবং  অন্য মেয়েদের স্কুলে যেতে অনুপ্রেরণা যোগাতেন।  

২০১২ খ্রিষ্টাব্দের ৯ অক্টোবর। স্কুলের বাসে একজন বন্দুকধারী তাকে লক্ষ্য করে গুলি করলে বেশ কয়েকদিন অচেতন ছিলেন। পরবর্তীতে তাকে  উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্রিটেনের বার্মিংহ্যামে কুইন এলিজাবেথ হাসপাতালে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। ওখানে চিকিৎসা নিয়ে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

মালালাকে নোবেল শান্তি পুরষ্কার দেওয়ায় সমালোচকরা জানান, নারী শিক্ষা নিয়ে তার আবেগ/আগ্রহ/সংগ্রামকে আমরা সম্মান করি। তাই বলে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তাকে নোবেল পুরস্কার দিতে হবে? বাকি জীবনে মালালা যদি কোনা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন, তখন নোবেল কমিটি তাকে আরেকটি নোবেল দেবে কিনা-এ প্রশ্নও ছুড়ে দেন নোবেল কমিটির  বিরুদ্ধে।



এছাড়া, ১৯৪৫ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কর্ডেল হোল, ১৯৭৮ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সা'দাত, ১৯৯০ সালে ভারতে নির্বাাসত তিব্বতের  দালাই লামা, ১৯৯২ সালে গুয়াতেমালার মানবাধিকার কর্মী রিগোবার্টা মেঞ্চু, ১৯৯৪ সালে ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত ও ইসরায়েলের শিমন পেরেজ, ২০০২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের নোবেল শান্তি পুরষ্কার নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা হয়।

আবার যোগ্য লোক এবং পাঁচবার নমিনেশন পেলেও নোবেল শান্তি পুরষ্কার ভাগ্যে জোটেনি ভারতের জাতির  পিতা মহাত্মা গান্ধীর। এজন্য অবশ্য নোবেল কমিটিকে পরে আফসোসও করতে শোনা যায়। ২০০৬ সালে নোবেল ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক গিওর লুন্ডেস্টড্ দুঃখ করে বলেছিলেন, নোবেল কমিটির ইতিহাসের অন্যতম বড় ভূল হলো-মহাত্মা গান্ধীর নোবেল পুরষ্কার না পাওয়াটা। মহাত্মা গান্ধী নোবেল শান্তি পুরষ্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় পাঁচবার নমিনেশন পেয়েছিলেন। তবে প্রতিবারই অদৃশ্য কারণে তাকে নোবেল শান্তির জন্য মনোনীত করা হয়নি।

নোবেল পুরষ্কারকে অনেকেই সম্মানের পুরস্কার মনে করলেও অনেকে আবার পুরস্কার নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। এমনি দুজন বিজয়ী স্বেচ্ছায় এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন। একজন হলেন- ফরাসি অস্তিত্ববাদী দার্শনিক, নাট্যকার, সাহিত্যিক ও সমালোচক জ্য পল সার্ত্রে। তিনি  ১৯৬৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেও তা নিতে অস্বীকৃতি জানান। আর ভিয়েতনামের বিপ্লবী নেতা লে ডুক থো ১৯৭৪ সালে নোবেল পুরস্কার নিতে অস্বীকৃতি জানান হেনরি কিসিঞ্জারতে নোবেল দেওয়ার কারণে।

Link copied!