অক্টোবর ১৯, ২০২২, ১০:১৭ পিএম
আড়াই দশক পর ভারতের গান্ধী পরিবারের বাইরে কেউ সভাপতি হলেন প্রাচীন দল কংগ্রেসের। ভোটের লড়াইয়ে অপর কংগ্রেস নেতা শশী থারুরকে বিপুল ভোটে হারিয়ে সভাপতির পদে বসলেন মল্লিকার্জুন খাড়গে। গান্ধী পরিবারের অনুগত খাড়গে হলেন ভারতীয় কংগ্রেসের ৮১তম সভাপতি এবং স্বাধীনতার পর ১২তম অগান্ধী সভাপতি। এর আগে ২০০০ সালে শেষবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল কংগ্রেস সভাপতি পদের জন্য। সেবার জগজীবন রামকে হারিয়ে সভাপতি হয়েছিলেন সনিয়া গান্ধী।

নির্বাচনের আগে থেকেই গুঞ্জন চলছিলো কংগ্রেসের নতুন সভাপতি হতে চলেছেন গান্ধী পরিবারের অনুগত নেতা খাড়গে। অবশেষে সেই গুঞ্জনই সত্যি হলো। কংগ্রেস প্রতিনিধিদের ভোট গণনার পর দেখা যায়, মোট ভোট পড়েছিল ৯ হাজার ৩৮৫টি। এর মধ্যে মল্লিকার্জুন পান ৭ হাজার ৮৯৭ ভোট। আর দলের সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত প্রার্থী শশী পান মাত্র ১ হাজার ৭২টি ভোট। বাতিল হয়েছে ৪১৬টি ভোট।
১৮৮৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পার্টির প্রতিষ্ঠার পর কেটে গেছে প্রায় ১৩৭ বছর। এই দীর্ঘ যাত্রায় এবারসহ ষষ্ঠবারের মতো সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে সভাপতি বেছে নেওয়া হলো।

গান্ধী পরিবারের বাইরে সবশেষ কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন সীতারাম কেশরী। নরসীমা রাওয়ের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রায় দুই বছর পর কেশরীর কাছ থেকেই ১৯৯৮ সালে দায়িত্ব বুঝে নেন সোনিয়া গান্ধী। সোনিয়া গান্ধী ১৯ বছর কংগ্রেসের হাল ধরেছিলেন। ২০১৭ সালে ছেলে রাহুলের হাতে দায়িত্ব দিয়ে তিনি দলের নেপথ্যে এসে দাঁড়ান। সেই রাহুল সাধারণ নির্বাচনে টানা দ্বিতীয়বার দলের ভরাডুবির পর ২০১৯ সালে সরে দাঁড়ান।
১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা লাভের পরপরই ১৯৪৮-৪৯ মেয়াদে জাতীয় কংগ্রেসের অগান্ধী সভাপতি হন পট্টভি সীতারামাইয়া। পরবর্তীতে মল্লিকার্জুনসহ মোট ১২ জন অগান্ধী ভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছেন।

পরের বছর পুরুষোত্তম দাস ট্যান্ডন হন সভাপতি। ১৯৫১-৫৪ মেয়াদে সভাপতির পদ গান্ধী পরিবারের দখলে চলে যায়। ১৯৫৫-৫৯ মেয়াদে আবারও অগান্ধী সভাপতি হন উচ্ছঙ্গরায় নবলশংকর ধেবর বা ইউএন ধেবর। ১৯৫৯ সালে কয়েক মাসের জন্য সভাপতি হিসেবে ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেসের হাল ধরেন। পরবর্তীতে ১৯৬০-৬৩ মেয়াদে আবারও অগান্ধী নীলম সঞ্জীব রেড্ডি, ১৯৬৪ থেকে ৬৭ সাল পর্যন্ত সভাপতি হন কুমার স্বামী কামরাজ নাদার।
১৯৬৮ সাল থেকে ৮৯ সাল পর্যন্ত এস নিজলিঙ্গপা, ১৯৭০ থেকে ৭১ পর্যন্ত জগজীবন রাম, ১৯৭২ থেকে ৭৪ পর্যন্ত শঙ্কর দয়াল শর্মা, ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত দেবকান্ত বড়ুয়া এবং ১৯৭৭-৭৬ মেয়াদে কে ব্রহ্মানন্দ রেড্ডি কংগ্রেসের সভাপতি হন। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত এবং ১৯৮৫ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব সামলান গান্ধী পরিবারের সদস্য ইন্দিরা গান্ধি ও রাজিব গান্ধি। পরবর্তীতে ১৯৯৩-৯৪ মেয়াদে পিভি নরসিংহ রাও এবং ৯৬-৯৮ মেয়াদে সীতারাম কেশরী জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব সামলান।

কর্ণাটকের বিদর জেলায় জন্মগ্রহণকারী মল্লিকার্জুনের স্নাতক ডিগ্রির পাশাপাশি আইনেও ডিগ্রি রয়েছে। বিচারপতি শিবরাজ পাতিলের অফিসে একজন জুনিয়র হিসাবে তাঁর আইনী ব্যবসা শুরু। প্রথম দিকে শ্রমিক সংগঠনগুলির জন্য মামলা করে ব্যাপক আলোচনায় আসেন তিনি। প্রভাবশালী শ্রমিক নেতা হিসেবে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে অনেক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন এই দলিত নেতা।
১৯৬৯ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান করে গুলবার্গ নগর কংগ্রেস কমিটির সভাপতি হন। ২০০৮ সালে কর্ণাটক প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ছিলেন। ওই সময় রাজ্যের বিধানসভায় বিরোধী দলের দায়িত্বও সামলান প্রবীণ এই রাজনীতিক।

মল্লিকার্জুন টানা ১০ বার বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করে রেকর্ড গড়েন। ২০১৪-২০১৯ সময়কালে লোকসভায় কংগ্রেস দলের নেতা ছিলেন তিনি। ২০১৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ছিলেন মল্লিকার্জুন। এর আগে ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন তিনি।
খাড়গের আগে গান্ধী পরিবার চাইছিলো রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট সভাপতি হয়ে কংগ্রেসের হাল ধরুক। তবে তিনি সরে দাঁড়ান। তাঁর সরে দাঁড়ানো নিয়ে গুঞ্জন আছে। সভাপতি পদে নমিনেশন পত্র জমা দেওয়ার আগে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, গান্ধী পরিবারের বাইরে কেউ কংগ্রেসের সভাপতি হলেও রাহুল গান্ধী পরামর্শদাতা হিসেবেই থাকবেন।

প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর ওই মন্তব্যের পর প্রার্থী হতে চাইছিলেন না অশোক। ৭১ বছর বয়সী কংগ্রেসের এই প্রবীণ নেতা ভালো করেই জানেন, কংগ্রেস সভাপতি হলেও তাঁকে কাজ করতে হবে সোনিয়া-রাহুলদের ইশারাতেই। নতুন সভাপতি মল্লিকার্জুনও কি তাঁদের ইশারাতেই চলবেন, নাকি কারিশম্যাটিক লিডারশিপের মাধ্যমে কংগ্রেসের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনবেন— এ প্রশ্নের জবাব দেবে ভবিষ্যতই।

তাছাড়া মল্লিকার্জুন খাড়গে কংগ্রেসের দায়িত্ব পেয়েছেন এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, যখন ২০২৪-এর নির্বাচনের পদধ্বনি শুরু হয়ে গিয়েছে। বেশ কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচন দোরগোড়ায়। মোদী-রাজ্য গুজরাত যেমন রয়েছে, রয়েছে নিজের রাজ্য কর্নাটক। তারপর তো বড় রাজ্যের মধ্যে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড় রয়েছেই। এই অবস্থায় দলিত নেতাকে সর্বভারতীয় সভাপতি করে কংগ্রেস এক বিশেষ বার্তাই দিয়ে দিল ভোটারদের। কারণ এসব রাজ্যে দলিত ভোট বড় একটি ফ্যাক্টর। খাড়গে যদি তাঁর পুরোটা ঢেলে দিতে পারেন, কংগ্রেস তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছে যেতে পারবে বলেই অনেকের বিশ্বাস।