আগস্ট ৩১, ২০২২, ১০:০০ পিএম
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের শেষ প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ পরিচিত ছিলেন 'গণতন্ত্রের পূজারী' হিসেবে। যার আমলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে ১৫ টি রাষ্ট্রের জন্ম হয়।তাঁর আমলেই আমেরিকার সাথে রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র কমানো ও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা কমানোর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
১৯৯০ সালে 'নোবেল শান্তি পুরস্কার' পাওয়া রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের একদিকে সমর্থক আবার আরেকদিকে কঠোর সমালোচকও। ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ছিলেন গর্বাচেভ। তিনিই সবচেয়ে কম বয়সে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে এসেছিলেন।

১৯৩১ সালে উত্তর ককেশাস অঞ্চলের স্টেভরপোলে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম গর্বাচেভের। সাবেক সোভিয়েত এই নেতার তার বয়স যখন ১১ বছর, তখন জার্মান বাহিনী তাদের গ্রাম দখল করে নেয়। জার্মান সেনাদের নির্যাতন ও গ্রামের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা তার মধ্যে যুদ্ধবিরোধী মনোভাবের জন্ম দেয়।
আইন বিষয়ে পড়তে ১৯৫০ সালে তিনি মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে যোগ দেন। আইন বিষয়ে ভালো জ্ঞান আর দক্ষতার কারণে ১৯৮০ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির কনিষ্ঠতম পলিটব্যুরো সদস্য নিযুক্ত হন। ১৯৮৫ সালে পার্টির মহাসচিবের দায়িত্ব পান।
গর্বাচেভ তার পূর্বসূরীদের তুলনায় ছিলেন তরুণ এবং সক্রিয়। তিনি সহজে মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারতেন। মানুষের সঙ্গে সহজে মিশতে পারতেন। হাসি ও মনোযোগ দ্বারা মানুষের সংঘবদ্ধ করতেন। তখন সমাজতন্ত্রের পরাশক্তির নতুন নেতাকে এভাবেই টেলিভিশনে উপস্থাপন করা হতো।
দলের ক্ষমতা নেওয়ার পরেই তিনি সংস্কার কর্মসূচিতে হাত দেন। তিনি ‘গ্লাসনস্ত’ ও ‘পেরেস্ত্রইকা’ নামে দুটি সংস্কার নীতি চালু করেন। ‘পেরেস্ত্রইকা’ হল গর্বাচেভের একটি অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি, যার উদ্দেশ্য অর্থনীতিকে বাজার ব্যবস্থার উপর ছেড়ে দিয়ে একটি অবাধ অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা।অন্যদিকে ‘গ্লাসনস্ত’ হল তার একটি রাজনৈতিক কর্মসুচি, যার উদ্দেশ্য নাগরিকের ধর্মীয় ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করা। তার এই নীতি গণতন্ত্রের এক নতুন দ্বারকে উন্মোচন করে এবং বহু কারাবন্দী গণতান্ত্রিক নেতার মুক্তি নিশ্চিত করে।
গর্বাচেভ বুঝতে পারেন যে, প্রতিরক্ষায় ব্যয়বহুল বাজেট দিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই বিশ্বনেতাদের কাছে সম্পর্ক বাড়াতে লাগলেন মিখাইল। ঠান্ডা যুদ্ধে ইতি টানতে ১৯৮৭ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়,ইন্টারমিডিয়েট নিউক্লিয়ার ফোর্স ট্রিটি।তাতে স্থির হয়, ৫০০ থেকে ৫৫০০ কিলোমিটারের মধ্যে অর্থাৎ মাঝারি পাল্লার কোনও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়বে না দু’পক্ষ। চিরাচরিত এবং পরমাণু, দু’ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের উপরেই এই নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।ওই চুক্তিতে পারমাণবিক অস্ত্র কমানো ও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা কমানোর শর্ত যুক্ত করেন।
চার বছর পর গর্বাচেভ জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের সঙ্গে দ্য স্ট্র্যাটেজিক আর্মস রিডাকশন ট্রিটি নামের আরেকটি চুক্তি করেন। যাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার কমে যায়। এরপর ১৯৮৬ সালে চেরনোবিল পারমাণবিক কেন্দ্রে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ ঘটে। মারা যান ৩২ জন।এই বিপর্যয়ের কারণে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতি গর্বাচেভের ঘৃণা বৃদ্ধি হয়। যার জেরে ১৬ দিন জনসমক্ষে আসেননি গর্বাচেভ।গর্বাচেভের সময়ই আফগানিস্তানে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসে সোভিয়েত ইউনিয়ন।
শীতলযুদ্ধের শান্তিপূর্ণ অবসান ঘটাতে বিশেষ ভূমিকা রাখায় ১৯৯০ সালে শান্তিতে নোবেল পান মিখাইল গর্বাচেভ। আবার এই মানুষটিই এক বছর পর ১৯৯১ সালে বাল্টিক দেশগুলোর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা মাটিতে মিশিয়ে দিতে দেশগুলোতে সামরিক ট্যাঙ্ক পাঠান।

সোভিয়েত ইউনিয়নের কঠোর অবস্থানের বিরুদ্ধে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করছিল।১৯৯১ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে ১৫ টি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ১৯৯১ সালে গর্বাচেভের বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থান হয়। অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলেও কমিউনস্ট পার্টির ‘পলিটব্যুরো’ সদস্য পদ হারান।
সমালোচনার ঝড় ওঠে বিশ্বজুড়ে। সাংবাদিকরা বলতে শুরু করেন, "সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন একটা ষড়যন্ত্রের ফল। ষড়যন্ত্রের হোতা মিখাইল গর্বাচভ; তিনি আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর এজেন্ট। তিনি নিজের চারপাশে যেসব লোককে জড়ো করেছিলেন, তাঁরাও সবাই ছিলেন পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিশ্বের ঠিকাদার। এই ঠিকাদার চক্র আমেরিকা ও তার পুঁজিবাদী মিত্রদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙেছে। নইলে দেশটির পতনের কোনো কারণ ছিল না।"
দেশের অভ্যন্তরে অভিযোগ উঠল তিনি নাকি মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের বিলোপ ঘটিয়েছেন!! তিনি পশ্চিমা দুনিয়ার হাততালি পেয়ে ভুলে গেছেন তিনি কাদের প্রেসিডেন্ট।কমিউনিস্ট পার্টি, সেনাবাহিনী, কেজিবি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনেকে গর্বাচভের পাশ থেকে সরে গেলেন। সেসময় ইয়েলৎসিন নামে এক নেতা ধীরেধীরে জনপ্রিয়তা অর্জন করছিলেন। তাঁর জনপ্রিয়তা হঠাৎ করে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বেড়ে গেল। লোকজন ভাবতে শুরু করল, এই লোকটিই তাদের ‘ত্রাণকর্তা’। ইয়েলৎসিনই এই দুর্দশা থেকে তাদের উদ্ধার করতে পারবেন। ১৯৯১ সালের জুন মাসে তাই রুশ প্রজাতন্ত্রের ভোটাররা গর্বাচেভের জায়গায় ইয়েলৎসিনকে তাদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করল। গর্বাচেভের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বিশ্বে চার দশক ধরে চলা স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি হল।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে গর্বাচেভ আখ্যায়িত হন ইতিহাসের এক ‘কলঙ্কিত নায়ক’ হিসাবে। কিন্তু বিশ্বের একটা বড় অংশের মানুষের কাছে তিনি 'গণতন্ত্রের পূজারী'। সূত্র: এশিয়া নেটনিউজডটকম