নতুন একটি চায়ের দোকান। নাম ‘এমএ ইংলিশ চায়েওয়ালি’। নামটি শুনে সচেতন যেকোনো মানুষই বিস্মিত হবেন নিঃসন্দেহে। তবে এ নামের পেছনে রয়েছে জীবন সংগ্রামে হার না মানা এক তরুণীর গল্প। আর এই নামের মধ্য দিয়ে টুকটুকি দাস নামে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ২৬ বছর বয়সী এক তরুণী সমাজকে কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
সোমবার (১ নভেম্বর) থেকে চায়ের দোকানটি চালু করেছেন তিনি। ভারতের উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে চালু হয় তার স্বপ্নযাত্রা। দোকান্টিকে তিনি রূপ দিতে চান ব্র্যান্ডে।
টুকটুকি দাস রবীন্দ্রভারতী মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দূরশিক্ষায় ইংরেজিতে ৬১ শতাংশ নম্বর নিয়ে স্নাতকোত্তর হয়েছেন বছরখানেক আগে। বেশ কয়েকটি পরীক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু চাকরি নামে সোনার হরিণ পাওয়ার সৌভাগ্য তার হয়নি।
একসময় টুকটুকি বুঝতে পারে এ রকম বেশি দিন চলতে থাকলে হতাশা বাসা বাঁধবে। চাকরির মুখ চেয়ে বসে থাকলে চলবে না বলে মনস্থির করেন তিনি। শুরু হয় টুকটুকির অন্বেষণ। তাঁর বাবা প্রশান্ত বাড়িতেই মুদির দোকান চালান। সংসার টানতে মাঝে মধ্যে ভ্যানরিকশাও চালাতে হয়। তখন দোকানে বসেন টুকটুকির মা। দাদা থাকেন মধ্যমগ্রামে। পারিবারিক পুঁজি নেই যে বড় ব্যবসা দাঁড় করাবেন টুকটুকি।
ইউটিউব ঘাঁটতে ঘাঁটতে তিনি এক দিন খোঁজ পান মুম্বইয়ের এক চায়ের দোকানের। সেটিও তৈরি করেছেন উচ্চশিক্ষিত এক যুবক। দোকানের নাম দিয়েছেন নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতাকে জুড়ে দিয়ে। সেই নামই ক্রমশ ‘ব্র্যান্ড’ হয়ে উঠছে ইদানীং। পথটা মনে ধরে টুকটুকির। কিন্তু কথাটা হজম করতে পারছিলেন না বাবা-মা, প্রশান্ত-দেবিকারা। হাবড়া শ্রীচৈতন্য কলেজ থেকে ইংরেজি নিয়ে পাস করে, এমএ উত্তীর্ণ মেয়ে খুলবে চায়ের দোকান! তা-ও নিজের এলাকায়। পাঁচ জন কী বলবে?

জেদ ধরে বসেন টুকটুকি। তাঁদের বোঝান, চাকরি না পাওয়ার হতাশায় ডুবে যাওয়ার পথ তাঁর জন্য নয়। বরং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখবেন সম্মানজনক উপায়ে। ইউটিউব থেকে এ ধরনের আরও চায়ের দোকান খুঁজে বাবা-মাকে দেখান তিনি, যা তৈরি হয়েছে শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের উদ্যোগে।
এক সময়ে মত দেন বাবা-মা। সেই মতো মাসে ১ হাজার ৮০০ টাকায় চার ফুট বাই চার ফুটের দোকান ভাড়া নিয়ে ফেলেছেন টুকটুকি। সোমবার (১ নভেম্বর) থেকে চালু হয়েছে চা বিক্রি। ৫ থেকে ৩৫ টাকা দামের নানা রকম চা মিলছে। একা হাতেই সব সামলাচ্ছেন টুকটুকি। দোকানের শুভ মহরতে অনেককে বিনা পয়সায় চা খাইয়েছেন বলে তিনি জানালেন।
চায়ের দোকান খোলায় লোকজন কী বলছেন?-এমন প্রশ্নের জবাবে একগাল হেসে টুকটুকি বলেন, ‘‘প্রথম দিন অনেকে খুব উৎসাহ দিয়ে গেলেন।’’ কিন্তু শুরুর লড়াইটা ছিল ঘরে-বাইরে। চায়ের দোকান দেবে একটা মেয়ে, এ কথা শুনে অনেকে দোকান ভাড়াই দিতে চাইছিলেন না।
টুকটুকি বলেন, “অনেকে বলেছেন এ সব তোমার দ্বারা হবে না।’ সে কথা শুনে চোয়াল আরও শক্তই হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘আমি মনে করি, কোনও কাজই ছোট নয়। ইচ্ছে আছে, চায়ের দোকানটাকে দাঁড় করিয়ে নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি করব। নিজের পরিচিতি গড়ে তুলব।’’
কিন্তু দোকানের নাম এমন ধারা কেন? শিক্ষিত হয়েও চাকরি না পাওয়ার যন্ত্রণা? শিক্ষাব্যবস্থাকে কটাক্ষ? এর জবাবে টুকটুকি বলেন, ‘‘না না, ও সব কিছু নয়’’। তাঁর কথায়, ‘‘দোকানের নামে নতুনত্ব রাখতে চেয়েছি। শিক্ষিত হয়েও যে কোনও কাজে এগিয়ে আসা যায়, সেই বার্তাও হয়তো আছে এই নামে।’’
কিন্তু এমএ পাস মেয়ের চায়ের দোকানের এ ধরণের নাম কি রাজ্যের শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে টুকটুকির দাবি, সমাজের কিছু নির্দিষ্ট ধারণা থেকেই প্রচলিত চাহিদা হল, সরকারি চাকরি। দেশের সামাজিক কাঠামো অনুযায়ী কে কী ধরনের কাজ করবেন, তা যেন গতে বাঁধা। তাঁর কথায়, ‘‘এটি কর্মসংস্থান নয়, সমাজের সমস্যা। বাঁধা গতে না চললে বলা হয়, কিছুই যেন হল না জীবনে।’’
সূত্র: আনন্দবাজার