এফবিআইয়ের প্রথম ১০ ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’তালিকায় একমাত্র নারী তিনি

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

জুলাই ২, ২০২২, ০৬:৩৮ পিএম

এফবিআইয়ের প্রথম ১০ ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’তালিকায় একমাত্র নারী তিনি

ভুয়ো অর্থলগ্নি সংস্থা খুলে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এক নারীর বিরুদ্ধে। এভাবে মাত্র তিন বছরের মধ্যে অন্তত ৪০০ কোটি ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা(১ ডলার=৯৩.৪৫ টাকা)।

গত বৃহস্পতিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা- ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন বা এফবিআই’র  মোস্ট ওয়ান্টেড ১০ জন অপরাধীর তালিকায় ঢুকে পড়েছেন তিনি। ভারতীয় গণমাধ্যম আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনে তার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

কে এই ‘ক্রিপ্টোকুইন’?

২০১৭ সালের অক্টোবরে আচমকাই গায়েব হয়ে যান ‘ক্রিপ্টোকুইন’। তার পর থেকে হন্যে হয়ে খুঁজেও তাঁকে ধরতে পারেনি এফবিআই। তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করেছে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাটি।

এফবিআইয়ের খাতায় ‘ক্রিপ্টোকুইন’ নামে পরিচিত এই মহিলার পোশাকি নাম রুজা ইগনাতোভা। বুলগেরিয়ার পাশাপাশি জার্মানিরও নাগরিক রুজার বিরুদ্ধে কোটি কোটি ডলার ‘লুট’ করার অভিযোগ তুলেছে এফবিআই। তাঁর সম্পর্কে কেউ কোনও তথ্য দিতে পারলে এক লক্ষ ডলারের পুরস্কারও ঘোষণা করেছে তারা। ভারতীয় মুদ্রায় যার মূল্য ৭৯ লক্ষ টাকার বেশি।

এফবিআইয়ের পাশাপাশি ইউরোপীয় গোয়েন্দাদের নজরে রয়েছেন রুজা। মে মাসে তাঁকে মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকাভুক্ত করে ইউরোপোল। সঙ্গে গ্রেফতারিতে সাহায্য হয়, এমন তথ্য দিতে পারলে চার লাখ ডলারেরও বেশি পুরস্কারমূল্যের ঘোষণা করে। তবে ইউরোপ হোক বা আমেরিকা, কোনও দেশের গোয়েন্দারাই রুজাকে পাকড়াও করতে পারেননি।

রুজার শৈশব, শিক্ষা ও কর্মজীবন

৪২ বছরের রুজার জন্ম হয়েছিল বুলগেরিয়ার সোফিয়ায়। তবে ১০ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে জার্মানির স্রামবার্গ শহরে চলে যান তিনি। সেখানেই বে়ড়ে ওঠা। পড়াশোনা করা।

গোয়েন্দাদের দাবি, আর পাঁচটা ঝানু অপরাধীর মতো নন রুজা। বরং তিনি উচ্চশিক্ষিত। আইনের মারপ্যাঁচ সম্পর্কেও যথেষ্ট ওয়াকিবহাল।

আমেরিকার গোয়েন্দাদের দাবি, ২০০৫ সালে জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাইভেট ইন্টারন্যাশনাল ল’ নিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন রুজা। যদিও অনেকের দাবি, অক্সফোর্ড থেকে পিএইচডি ডিগ্রি রয়েছে তাঁর। উচ্চশিক্ষা শেষে ম্যাকিনসে-র মতো বহুজাতিক সংস্থায় নাকি চাকরিও করেছেন। এক কালে উরসুলায় একটি সালোঁতে বিনিয়োগও করেছিলেন রুজা। সেটা ছিল ২০১১ সালে নভেম্বর।

যেভাবে রুজার অপরাধ ফাঁস হয়

রুজার অপরাধের কাহিনি প্রথম প্রকাশ্যে আসে ২০১২ সালে। সঙ্গে ছিলেন তাঁর বাবা প্লামেন ইগনাতোভও। সে বছর জার্মানির একটি সংস্থার অধিগ্রহণের মামলায় প্রতারণার অভিযোগে দু’জনকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। ওই মামলায় ১৪ মাসের কারাবাসের সাজা হয়েছিল রুজার।

জেলে থাকাকালীনই সম্ভবত অপরাধজগতে পাকাপাকি ভাবে প্রবেশ করে ফেলেছিলেন রুজা। ২০১৩ সালে বিগকয়েন নামে একটি ক্রিপ্টোকারেন্সির মার্কেটিং সংক্রান্ত প্রতারণায় জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।

এফবিআইয়ের দাবি, ২০১৪ সাল থেকে পন্‌মাধ্যমে লোকঠকানোর ব্যবসাও জি স্কিমের কারবারে ঢুকে ঢুকে প়ড়েন রুজা। সে বছরের অক্টোবরে ওয়ানকয়েন নামে ক্রিপ্টোকারেন্সির শুরু করেন বলে অভিযোগ। গোয়েন্দাদের দাবি, বিশ্ব জুড়ে সে কারবারের জাল ছড়াতে ইউটিউব-সহ একাধিক নেটমাধ্যমের সাহায্য নিয়েছিলেন রুজা।

সংবাদমাধ্যমে আমেরিকার গোয়েন্দাদের দাবি, ২০১৪ সালে ওয়ানকয়েনে বিনিয়োগ করলে প্রচুর মুনাফা হবে বলেও চাউর করতে থাকেন রুজা। বিনিয়োগকারীরা যত লোককে এই ক্রিপ্টোকারেন্সি সংস্থায় টেনে আনতে পারবেন, তাঁদের তত লাভ হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি।

স্মার্ট, ঝকঝকে চেহারার উচ্চশিক্ষিত রুজার কথায় অনেকেই নাকি ওয়ানকয়েনে বিপুল বিনিয়োগ করেছেন। এমনই জানিয়েছেন এফবিআইয়ের গোয়েন্দারা। যদিও এফবিআইয়ের মতে, ওয়ানকয়েন নামের ক্রিপ্টোকারেন্সির (ইন্টারনেটের মাধ্যমে লেনদেনের ডিজিটাল মুদ্রা) আসলে শেয়ারবাজারে কোনও মূল্যই ছিল না। এমনকি, ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্লকচেন নামে যে আন্তর্জাল ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ হয় এবং যার মাধ্যমে গেলে বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাকে, সেই সুরক্ষাও ছিল না ওয়ানকয়েনের।

গোয়েন্দাদের দাবি,ওয়ানকয়েন আসলে ক্রিপ্টোকারেন্সির ছদ্মবেশে থাকা একটি পন্‌জি স্কিম। যার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কোটি কোটি ডেমিয়ান উইলিয়ামস নামে ম্যানহাটনের এক আইনজীবীর দাবি, ‘‘মোক্ষম সময়ে এই ভুয়ো সংস্থা খুলেছিলেন রুজা। যে সময় ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে মাতামাতি তুঙ্গে, তখনই তিনি এই কারবার ফেঁদে বসেন।’’টাকা লুটেছেন রুজা।

ডেমিয়ান উইলিয়ামস নামে ম্যানহাটনের এক আইনজীবীর দাবি, ‘‘মোক্ষম সময়ে এই ভুয়ো সংস্থা খুলেছিলেন রুজা। যে সময় ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে মাতামাতি তুঙ্গে, তখনই তিনি এই কারবার ফেঁদে বসেন।

’’ বছর দুয়েকের মধ্যে বিপুল মুনাফা করেছিল ওয়ানকয়েন। ২০১৪ সালের অর্থবর্ষের চতুর্থ ত্রৈমাসিক থেকে ২০১৬ সালে তৃতীয় ত্রৈমাসিকের মধ্যে ওয়ানকয়েন ৩৭৮ কোটি ডলারের মুনাফা করেছিল বলে দাবি এফবিআইয়ের আইনজীবীদের।

শেয়ারবাজারে মূল্যহীন হলেও মাল্টিলেভেল মার্কেটিং পদ্ধতিতে বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে রুজার ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠেছিল। এফবিআইয়ের দাবি, বিশ্ব জুড়ে ৩০ লক্ষ বিনিয়োগকারীকে শুধুমাত্র মোটা অঙ্কের কমিশনের লোভ দেখিয়ে তাঁর ভুয়ো সংস্থায় টেনে এনেছিলেন রুজা।

অপরাধের দিক দিয়ে বাবা-ভাইকেও ছাড়িয়ে যান

২০১৯ সালে আর্থিক প্রতারণা মামলায় নাম জড়িয়েছিল রুজার ভাই কনস্ট্যানটিন ইগনাতোভের। সে সময় আমেরিকার লস এঞ্জেলেসে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ওই মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন রুজার ভাই।

এফবিআইয়ের দাবি, অপরাধের নিরিখে বাবা এবং ভাইকে ছাপিয়ে গিয়েছেন রুজা। ২০১৭ সালে বুলগেরিয়ার সোফিয়া থেকে গ্রিসের যাওয়ার বিমানে উঠেছিলেন তিনি। তাঁর সঙ্গে যে পরিমাণ অর্থ ছিল ভারতীয় মুদ্রায় তার মূল্য পাঁচ কোটি টাকা। তার পর থেকে সেই যে গা-ঢাকা দিয়েছেন, আজ পর্যন্ত তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়নি।

Link copied!