বিয়ে কেবল একটি সামাজিক বন্ধনই নয়, এটি কি দীর্ঘ মেয়াদে শরীরকেও সুরক্ষিত রাখে?
সাম্প্রতিক এক বিশাল গবেষণায় দেখা গেছে, যারা কখনো বিয়ে করেননি তাদের তুলনায় বিবাহিত বা অতীতে বিবাহিত ছিলেন এমন ব্যক্তিদের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
যুক্তরাষ্ট্রের ১২টি অঙ্গরাজ্যের প্রায় ৪ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় উঠে এসেছে এই চমকপ্রদ তথ্য। ২০১৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ৩০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের ক্যান্সারের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, আমাদের সামাজিক জীবন কীভাবে আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে।
পুরুষ ও নারীদের ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান
গবেষণায় দেখা গেছে, অবিবাহিতদের (যারা কখনো বিয়ে করেননি) ক্ষেত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক বেশি:
অবিবাহিত পুরুষদের ক্ষেত্রে বিবাহিতদের তুলনায় ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি।
অবিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি—প্রায় ৮৫ শতাংশ।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, আগে ধারণা করা হতো বিয়ে থেকে পুরুষরা বেশি স্বাস্থ্যগত সুবিধা পায়। কিন্তু এই গবেষণা বলছে, নারীরা অন্তত পুরুষদের সমান বা তার চেয়েও বেশি সুরক্ষা পাচ্ছেন। বিশেষ করে ৫০ বছর বয়সের পর এই পার্থক্য আরও প্রকট হয়।
ক্যান্সারের ধরণ ও জীবনযাত্রার প্রভাব
সব ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান সমান নয়। গবেষকরা দেখেছেন:
সংক্রমণজনিত ক্যান্সার: হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (HPV) সংশ্লিষ্ট ক্যান্সারে অবিবাহিতদের ঝুঁকি অনেক বেশি। অবিবাহিত পুরুষদের অ্যানাল ক্যান্সারের হার বিবাহিতদের চেয়ে ৫ গুণ এবং অবিবাহিত নারীদের জরায়ুমুখের ক্যান্সারের হার প্রায় ৩ গুণ বেশি।
হরমোনজনিত কারণ:
জরায়ু বা ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের হার অবিবাহিত নারীদের মধ্যে বেশি দেখা গেছে। গবেষকদের মতে, সন্তান জন্মদান এবং প্রসবের ফলে হরমোনের যে পরিবর্তন হয়, তা এই ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
স্ক্রিনিং বা স্বাস্থ্য পরীক্ষা:
স্তন বা প্রোস্টেট ক্যান্সারের মতো রোগগুলোতে বিবাহিত-অবিবাহিত পার্থক্য কম। কারণ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা স্ক্রিনিং এই ঝুঁকিগুলোকে কমিয়ে সমতায় নিয়ে আসে।
বর্ণভেদে প্রভাব
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অবিবাহিত কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের মধ্যে ক্যান্সারের হার সবচেয়ে বেশি। কিন্তু মজার বিষয় হলো, বিবাহিত কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের ক্যান্সারের হার বিবাহিত শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের তুলনায় কম। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিয়ে বিশেষ সুরক্ষা প্রদান করে।
বিয়ে নাকি অন্য কিছু?
গবেষকরা সাবধান করে দিয়েছেন যে, বিয়ে সরাসরি ক্যান্সার ঠেকায় এমন কোনো প্রমাণ নেই। তবে এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে:
১. সামাজিক চাপ ও যত্ন: বিবাহিত জীবনে স্বামী বা স্ত্রী একে অপরকে ডাক্তার দেখাতে বা নিয়মিত চেকআপ করতে উৎসাহ দেন।
২. আর্থিক ও বীমা সুবিধা: বিবাহিতদের ক্ষেত্রে যৌথ সম্পদ এবং স্বাস্থ্য বীমার সুবিধা নেওয়া সহজ হয়।
৩. সুস্থ জীবনযাত্রা:একাকী মানুষের তুলনায় বিবাহিতদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা কম এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার সুযোগ বেশি থাকে।
তবে এর উল্টো দিকটিও সত্য হতে পারে—যারা আগে থেকেই সুস্থ, আর্থিকভাবে সচ্ছল এবং মানসিকভাবে স্থিতিশীল, তাদেরই বিয়ে করার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
এই গবেষণার মূল বার্তাটি কেবল বিয়ের গুরুত্ব নিয়ে নয়, বরং সামাজিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। যারা একা থাকেন বা অবিবাহিত, তাদের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং সচেতনতা কর্মসূচি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন, স্বাস্থ্য বীমা এবং সঠিক সময়ে চেকআপ যেন কেবল বিবাহিতদের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করাই এখন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বড় চ্যালেঞ্জ।