‘ডলারকে ধরেন স্যার, সেও তো দোষী’: আত্মপক্ষ শুনানিতে সোহেল

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

জুন ৩, ২০২৬, ১২:৩২ পিএম

‘ডলারকে ধরেন স্যার, সেও তো দোষী’: আত্মপক্ষ শুনানিতে সোহেল

আদালতে সোহেল রানা | ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় আদালতে দাঁড়িয়ে বিচারকের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন প্রধান আসামি সোহেল রানা। অন্যদিকে মামলার অপর আসামি ও সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেছেন।

বুধবার (৩ জুন) ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় দুই আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দি ও জেরা শেষে আদালত আগামী বৃহস্পতিবার (৪ জুন) মামলার চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপনের দিন ধার্য করেন।

এদিন সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে কারাগার থেকে দুই আসামিকে আদালতে আনা হয়। বেলা ১১টা ১০ মিনিটে বিচারক এজলাসে ওঠার পর মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। এ সময় বিচারক আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং রাষ্ট্রপক্ষের ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জবানবন্দির সারসংক্ষেপ পড়ে শোনান।

এক পর্যায়ে বিচারক আসামিদের উদ্দেশে প্রশ্ন করেন, “আপনারা দোষী না নির্দোষ?”

জবাবে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সোহেল রানা বলেন, “স্যার,আমি নির্দোষ। খালাস চাই। আমাকে মাফ করে দেন। আমার সাথে ডলার ছিলো, সেটা কেউ দেখে নাই। তাকে ধরেন স্যার। সেও তো দোষী।”

অপরদিকে স্বপ্না আক্তার নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন।

পরে আদালতের বেঞ্চ সহকারী পঙ্কজ পিটার গোমেজ জানান, মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য আগামী বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করা হয়েছে।

শুনানিকালে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী, বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু এবং আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে মঙ্গলবার মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। রাষ্ট্রপক্ষের ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন। সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন রামিসার বাবা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা, মা পারভীন আক্তার, বড় বোন রাইসা আক্তার, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, পুলিশ সদস্য, চিকিৎসক, ম্যাজিস্ট্রেট এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

গত ১৯ মে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে রামিসার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন সকালে পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল রানা শিশুটিকে হত্যা করে তার মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। পরে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। তবে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ঘটনাস্থলেই ছিলেন। পুলিশ বাসা থেকে স্বপ্নাকে আটক করে এবং পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে।

ঘটনার দিনই রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় দুইজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। পরে সোহেল রানা আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান পাঁচ দিনের তদন্ত শেষে গত ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে একই দিন মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত করা হয়।

ঈদের ছুটি শেষে সোমবার প্রথম কার্যদিবসে দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত।

সেদিন শুনানি শেষে সাংবাদিকদের কাছে সোহেল দাবি করেন, তিনি শুধু রামিসাকে “দুই টুকরো” করেছেন। ধর্ষণ ও হত্যা করেছে ডলার নামের মিরপুরের এক ব্যক্তি। ডলারের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা নিয়ে তিনি এই কাজ করেছেন বলেও দাবি করেন।

মঙ্গলবার একদিনেই ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। এ সময় রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা সাক্ষ্যে বলেন, আর কোনো বাবা-মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়।

মামলার এজাহারে বলা হয়, পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সঙ্গে থাকতো রামিসা। সে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। সোহেল ও স্বপ্না ওই বাসার অন্য ফ্ল্যাটে সাবলেট থাকতেন। ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে রামিসা বাসা থেকে বের হলে আসামিরা ‘কৌশলে’ তাকে ভবনের তৃতীয় তলায় তাদের রুমে নিয়ে যায়। 

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে আসামিদের রুমের সামনে মেয়েটির স্যান্ডেল দেখতে পান তার মা। এরপর ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে রামিসার মা ফ্ল্যাটের অন্যদের নিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। এসময় সোহেল ও স্বপ্নার রুমে রামিসার মাথাবিহীন দেহ এবং বাথরুমের বালতির মধ্যে মাথা দেখতে পায়। স্বপ্না সেখানে দাঁড়ানো ছিলেন। 

মামলায় বলা হয়, পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না বলেছেন, রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মেরে ফেলেন সোহেল। লাশ গুম করার জন্য মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করেন এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ-বিচ্ছিন্ন করে মৃতদেহ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেন। কাটা মাথা বাথরুমের বালতির মধ্যে রেখে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যান। 

রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ওই নৃশংস ঘটনার পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সংগঠন ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ সমাবেশ, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়ে আসছেন।

Link copied!