ঋণখেলাপিরা রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে: রেহমান সোবহান

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

এপ্রিল ২০, ২০২৬, ১০:২৪ এএম

ঋণখেলাপিরা রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে: রেহমান সোবহান

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান বলেছেন, ঋণখেলাপিরা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠেছে এবং তারাই সংস্কারের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে সমস্যাটি ব্যক্তি নয়, বরং কাঠামোগত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংস্কার মানে শুধু আইন প্রণয়ন নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া—প্রথমে আইন, এরপর প্রশাসনিক কাঠামো গঠন, তারপর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সর্বশেষ ফলাফল মূল্যায়ন।

রোববার তিন দিনব্যাপী নবম সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের শেষ দিনে ‘সংস্কার নিয়ে মোহ: বাংলাদেশের গল্প’ শীর্ষক অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল পরিবর্তিত বিশ্বে উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ ও নীতিগত করণীয়।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান-এর সঞ্চালনায় অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। আলোচক হিসেবে ছিলেন সাবেক অর্থসচিব ও মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী।

রেহমান সোবহান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের সময় বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও সংস্কার বাস্তবায়নে তাদের প্রকৃত অঙ্গীকার ও নেতৃত্ব কতটা রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। অতীতে বড় সংস্কার তখনই সফল হয়েছে, যখন তা জনসমর্থন পেয়েছে—যেমন ছয় দফা আন্দোলন।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমানে এ ধরনের গণভিত্তিক প্রচার দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহার জনগণের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছাতে পারছে না। এমনকি অনেক দলের সদস্যই নিজেদের ইশতেহার সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না।

সংস্কার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, আলোচকদের মধ্যে কতজন সরাসরি সরকারে কাজ করার অভিজ্ঞতা রাখেন। তার মতে, বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়া সংস্কারের জটিলতা বোঝা কঠিন—কে সংস্কার চায়, কে বাধা দেয় এবং কেন অনেক উদ্যোগ সফল হয় না, তা মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ছাড়া স্পষ্ট হয় না।

তিনি বলেন, অনেক সময় সংস্কারকে তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, পরিকল্পনা কমিশনে কাজ করার সময় দেখেছেন, আইন পাস করানো বড় চ্যালেঞ্জ নয়; বরং সেটির কার্যকর বাস্তবায়নই সবচেয়ে কঠিন।

পুলিশ সংস্কারের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাস্তব ফলাফল দিয়েই সংস্কারের সাফল্য যাচাই করতে হবে। যেমন—পুলিশকে অভিযোগ গ্রহণে বাধ্যতামূলক করা হলে কয়েক বছর পর তা বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা পরীক্ষা করা উচিত।

বিশ্বব্যাংক বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-এর প্রস্তাবিত সংস্কার নতুন কিছু নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, সরকারগুলো প্রায়ই আর্থিক সহায়তার কিস্তি পেতে প্রাথমিক অগ্রগতি দেখালেও দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই হয় না।

বিচার বিভাগ ও বাজেট সংস্কারের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ১৯৯০-এর দশকে বড় উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সীমিত। রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট একীভূত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকলেও বাস্তবায়ন হয়নি।

তিনি পারফরম্যান্সভিত্তিক বাজেট ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন, যাতে ব্যয়ের পাশাপাশি ফলাফলও মূল্যায়ন করা যায়। বর্তমানে শুধু ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হলেও এর ফলাফল বিশ্লেষণ অনুপস্থিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও তা পুরোপুরি ব্যবহার না হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমস্যার মূল কোথায়—তা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন। জনগণ নিম্নমানের সেবা পাচ্ছে, আর শিক্ষার ফলাফল ভালো দেখালেও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

ভারতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে খাদ্য, শিক্ষা ও কাজের অধিকারসহ বড় সংস্কারগুলো শক্তিশালী নাগরিক আন্দোলনের মাধ্যমে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশে নাগরিক সমাজ বিভক্ত থাকায় বড় ধরনের সংস্কারের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ চাপ তৈরি হচ্ছে না।

সংস্কার বাস্তবায়নে বিরোধী দলের ভূমিকাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, বিরোধী দলের উচিত সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, আর সরকারের উচিত নিজেদের মধ্যেই শক্তিশালী জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

সবশেষে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই সংস্কারের চূড়ান্ত পরীক্ষা। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছাড়া প্রকৃত জবাবদিহি সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে ২০০১ সালে শেখ হাসিনা-র ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনাকে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি শক্তিশালী না হলে সংস্কারের পথ কঠিনই থেকে যাবে।

Link copied!