যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য তাইওয়ান ইস্যুতে অনেকটাই ঝুঁকির মুখে পড়েছে। করোনা পরিস্থিতির পর রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের ফলে ভবিষতে পণ্যমূল্যে ভারসাম্য থাকবে না বলে ধারণা ছিল বিশ্লেষকদের। যেটা তাইওয়ান সংকটে আরও বেশি জটিল হবে। সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।
ইলেকট্রনিক্স পণ্য যাবে নাগালের বাহিরে
ইতোমধ্যে মোবাইল, কম্পিউটার এর যন্ত্রাংশ ইত্যাদি অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় বাড়তি দামে রয়েছে। তাইওয়ান বিশ্বের ৯০ শতাংশ মাইক্রোপ্রসেসর চিপ উৎপাদন করে থাকে। কিন্তু চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজার দখলের নীতির কারনে তাইওয়ান বড় একটি ইস্যু ছিল বছরজুড়েই। কিন্তু এখন তাইওয়ান সংকটের ফলে উৎপাদন ব্যাহত হবার আশঙ্কা দেখা দেয়।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে লেখা হয়ে যে, গত তিন দশকে আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ বাড়ার সুবিধা পেয়ে আসছিল বহুজাতিক কোম্পানি এবং তাদের ভোক্তা দল। বর্তমান বাণিজ্যের যুগে ইলেকট্রনিক্স, অনেক পণ্যের ব্যাপক উৎপাদন ও সুলভ প্রবাহ ওইসব পণ্যের দাম কমিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
কিন্তু করোনা মহামারীর দুই বছরের ধাক্কা আর তারপর যুদ্ধের অস্থিরতা বাণিজ্য লক্ষ্মীর সেই আপাত সুস্থির বসতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আর তাতেই চেনা বাজার যেন হঠাৎ অচেনা হয়ে উঠতে শুরু করলো।
তাইওয়ান কেন ব্যবসায়িক আদর্শ
বৈশ্বিক সংযুক্তির যুগ মহামারীর আগ পর্যন্ত বজায় ছিল, আর তাতে আমেরিকাবাসীর অনেক পণ্য সস্তায় কেনার সুযোগ হয়েছিল। ওই ব্যবস্থা কম্পিউটার এবং অন্যান্য প্রযুক্তির কারখানাকে আরও দক্ষ করে তুলেছে। জুতা, রান্নার টেবিল ও ইলেকট্রনিক্সের মত পণ্যের সরবরাহকে করে তুলেছে সবচেয়ে সহজ।
কোম্পানিগুলো তাদের কারখানা নিয়ে গেছে এমন দেশে, যেখানে শ্রমের মজুরি কম। স্টিল শিপিং কনটেইনার, এবং বিশাল আকারের মালবাহী জাহাজে বোঝাই পণ্য দ্রুত বাংলাদেশ ও চীনের মতো দেশ থেকে মিসিসিপির সিয়াটল ও টুপেলো বন্দরে ভিড়েছে অনেক কম খরচে।
কিন্তু চীন এখন তাদের ব্যবসা বিভিন্ন দেশে স্থানান্তরিত করার চেষ্টায় আছে। সে হিসেবে তাইওয়ানে মূলত মাইক্রোপ্রসেসর ব্যবসা ছিল। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্রসেসর ক্রয় করতো। এছাড়া চীনের প্রতিষ্ঠানও তাইওয়ান নির্ভর। কিন্তু এই সংকটে মাইক্রোপ্রসেসর, জিপিইউ ইত্যাদি সরবারহ সংকটে ফেলবে।
মিলকেন ইনস্টিটিউট গ্লোবাল কনফারেন্সে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি ক্যাথেরিন টাই এক সাক্ষাৎকারে বলেন, একটি লম্বা সময় ধরে ভোক্তারা কম দামে আমদানি পণ্য পাওয়ার ‘বিলাসিতা’ উপভোগ করেছেন, কিন্তু এটা একটি ভিত্তির ওপর দাড়িয়ে আছে। কিন্তু ভবিষতে এই সুবিধা আর পাচ্ছে না।
পণ্য মজুতে দেখা দিচ্ছে সংকট
পণ্য কোথায় উৎপাদন করা হবে এবং মজুদ করে রাখতে হবে কিনা- তা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে কোম্পানিগুলোকে। এমনকী তাতে যদি পণ্য উৎপাদনের দক্ষতা কমে এবং খরচ বাড়ে, তাতেও হয়ত তারা ছাড় দেবে।
পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক বাধা এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার চাকা উল্টো পথে ঘুরতে শুরু করবে কিনা- তা নিয়ে অবশ্য বিতর্ক রয়েছে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে।
তবে যে কোম্পানিগুলো এতদিন যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলোর সীমানার বাইরে পণ্য উৎপাদন করে আসছিল, সঙ্কট দীর্ঘায়িত হলে তারা হয়ত রাজনৈতিক ঝুঁকি কমাতে আবার যুক্তরাষ্ট্রে বা আগের রুপে ফিরতে শুরু করবে। আর যদি সত্যি সত্যি সেটা ঘটে, সেসব কোম্পানির তৈরি করা অনেক পণ্য আর এখনকার মত সাশ্রয়ী দামে মিলবে না। কারণ তুলনামূলক সস্তা শ্রমের, স্বল্প আয়ের দেশে পণ্য উৎপাদন করে, কিংবা দেশে দেশে কারখানা খুলে সরবরাহের খরচ বাঁচিয়ে বছরের পর বছর ধরে কমিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছিল মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, গাড়ির মত অনেক পণ্যের দাম।
পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের ওই জটিল সুবিধা নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৫ সাল থেকে গাড়ি ও যন্ত্রপাতির মত দীর্ঘস্থায়ী পণ্যের মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে রাখা সম্ভব হয়েছিল।
পোশাক ও অন্যান্য স্বল্পমেয়াদী পণ্যের দামও বেড়েছে খুব ধীরে। তবে মহামারীর কারণে ২০২০ সালের শেষ দিকে এই ধারা বদলাতে শুরু করে। পণ্য সরবরাহের খরচ বাড়ার পাশাপাশি ঘাটতিও দেখা দেয়; বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গাড়ির জিনিসপত্র ও যন্ত্রপাতির দাম বাড়তে থাকে।
আগামীর ব্যবসা-বাণিজ্য কোন পথে যাবে?
বিশ্বায়ন নিয়ে এ প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের প্রধান জেরোম এইচ পাওয়েল বলেন, আমরা একটি ভিন্ন ধরনের বিশ্বের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হয়ত সেখানে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেশি থাকবে এবং কমে যাবে উৎপাদনশীলতা, কিন্তু অর্থনীতি আরও সহনশীল হয়ে উঠতে পারে, সরবরাহ আরও বাড়তে হতে পারে।