করোনা মহামারির মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। হল খুলে দেওয়ার দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলের তালা ভেঙ্গে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে প্রবেশের ঘটনা ঘএকই দাবিতে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ভবনের ফটকে তালা দিয়েছে শিক্ষার্থীরা।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও হল খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। এসব ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। কমিশনের এক সদস্য গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়ার পরই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দেওয়া হবে।
মহামারির মধ্যে ডাইনিং-ক্যান্টিন না খুললেও এরই মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আটটি হলে ফিরে এসেছেন চার শতাধিক শিক্ষার্থী, ক্যাম্পাসে যানবাহনও চলতে শুরু করেছে। দুদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন গেরুয়া এলাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষের পরে নিরাপত্তার দাবিতে শনিবার দিনভর বিক্ষোভ দেখিয়ে তালা ভেঙে হলে ঢুকে পড়েন শিক্ষার্থীরা। রবিবার তাদের সঙ্গে যোগ দেয় আরও অনেকে। এদিনে দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরে সংবাদ সম্মেলন করে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়, যার মধ্যে ক্যাম্পাস ও হল পুরোপুরি খুলে দেওয়ার দাবিও রয়েছে।
তবে সরকারিভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা হল খোলার কোনো ঘোষণা না আসায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার হুমকি দিয়ে আজ সোমবারের মধ্যে হল ছাড়তে বলেছে। এমতাবস্থায় ক্যাম্পাসে উত্তেজনা পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরুর পর সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও গতবছর ১৭ মার্চ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সেই সঙ্গে ক্যাম্পাসে দর্শনার্থী প্রবেশ এবং সব ধরনের অনুষ্ঠান ও জমায়েত নিষিদ্ধ' করে কর্তৃপক্ষ।
হল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগ বাড়ি ফিরে গেলেও তাদের একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের গেরুয়া, আমবাগান, ইসলামনগরসহ বিভিন্ন গ্রামে বাসা ভাড়া নিয়ে এবং মেসে থাকতে শুরু করেন। এছাড়া জুলাই থেকে অনলাইনে ক্লাসও শুরু হয়। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় গেরুয়া এলাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধলে অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থী আহত হন।
এর প্রতিবাদে কয়েকশ শিক্ষার্থী শনিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জড়ো হন এবং নিরাপত্তা চেয়ে এবং হল খুলে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে তারা নিজেরাই একে একে ১৬টি হলের সবগুলোর তালা ভেঙে ভেতরে ঢুতে পড়েন। তারা সবাই ক্যাম্পাসে অবস্থান করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থী পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের (৪৫তম ব্যাচ) তাবিয়া ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে ছাত্রী হলগুলোতে এখনও কেউ থাকছে না। আমরা আশা করছি, প্রশাসন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব হল খুলে দেবে।
এ বিষয়ে প্রক্টর আ স ম ফিরোজ উল হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসনের মধ্য দিয়ে চলে ঠিকই, তবে এই মহামারীতে একটা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রের বিপরীতে যেতে পারে না।
এদিকে, হল খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) শিক্ষার্থীরা। রবিবার বেলা ১২ টার দিকে বিষয়টি গণমাধ্যেমকে নিশ্চিত করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অন্যতম নেতা অমিত হাসান রক্তিম ও মাহমুদুল হাসান তমাল।
তিনি জানান, হল খুলে দেওয়ার দাবিতে ক্যাম্পাসে রাতযাপন কর্মসূচি পালন করছেন ববি শিক্ষার্থীরা। এর পাশাপাশি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার বিচারের দাবিতে টানা পঞ্চম দিনের মতো নানা কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষার্থীরা।
আবাসিক হলগুলো খুলে দেওযার দাবিতে আন্দোলন করছেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শনিবার সন্ধ্যা থেকে উপাচার্যের ভবনের সামনে প্রথমে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। রাত সোয়া ৮টার দিকে উপাচার্যের ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দাবি না মানলে টানা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা।
এর আগে. সন্ধ্যায় হল খোলার বিষয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত জানতে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি পাঠান শিক্ষার্থীরা। আবেদনের প্রেক্ষিতে ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক অধ্যাপক রাশেদ তালুকদার এসে পরীক্ষা শুরুর সাত দিন আগে হল খুলে দেওয়ার আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থিীরা তা নাকচ করে দেন।
রাত ৮টার দিকে ২৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হল খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে উপাচার্যের ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে থাকে।
গত ২৮ জানুযারি নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হলগুলো খোলার দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা বলেন, ’বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা নিশ্চই নাগরিক। নিজেদের সুরক্ষার ব্যাপারে তারা সচেতন। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি করছি।’
শিক্ষারর্থীরা আরও বলেন, দেশে আজ সব কিছু চালু, শুধু বন্ধ দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এভাবে আর কতদিন আমরা বসে থাকবো? একটি দেশের উন্নতির জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে সচল রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের দেশে কি হচ্ছে? বিশ্ববিদ্যালয় খোলা এখন সময়ের দাবি।’
আবাসিক হল খুল দেওয়ার আগ পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এরই ধারাবাহিকতায় আজ সোমবার থেকে সব আবাসিক হলের সামনে অবস্থান নিযেছেন তারা। এর আগে রবিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. শেখ আবদুস সালামের সঙ্গে সমস্যা নিয়ে আলোচনা শেষে শিক্ষার্থীরা এ ঘোষণা দেন। তারা বলেন, যতদিন পর্যন্ত হল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা না হবে ততদিনর পর্যন্ত আমরা আমাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও চাইছেন খুব দ্রুত হল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হোক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আন্তর্জাাতিক সম্পর্ক বিভাগের এক শিক্ষার্থী জানান, সাধারণ শিক্ষার্থীরা হলগুলো খুলে দেওয়ার দাবিতে খুব শিগগির আন্দোলনে যাবেন।
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দেওয়ার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। কমিশনের এক সদস্য বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কমিশনের সদস্য অধ্যাপক বিশ্বজিৎ চন্দ্র একটি গণমাধ্যমকে বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের ভ্যাকসিন দেয়ার একটি পরিকল্পনা করেছে সরকার।
তিনি বলেন, এখনতো ভ্যাকসিন দেয়া শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা টিকা নিচ্ছেন। এর পরের ধাপে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে যেসব শিক্ষার্থী থাকেন, তাদেরও টিকা দেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ভ্যাকসিন দেয়া সম্পন্ন হলেই বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হতে পারে।