কারও কাছে অতুলদা, কারও কাছে দাদাভাই, কেউ ডাকে এ পি সেন বা সেনসাহেব, কারও কাছে আবার প্রিয়বরেষু বা কবিবন্ধু। সব সম্বোধনের পিছনে যে মানুষটি ছিলেন, তার মুখে থাকতো সদা হাসি, গলায় থাকতো গান। পেশায় উকিল হলেও গানকে তিনি এতটাই ভালোবাসতেন, যে তাকে অনেকে বাংলা গানের সংগীত-সন্ন্যাসী বলেই ডাকতেন।
বাংলা ভাষা-সাহিত্যে ও সঙ্গীতের এক অতি পরিচিত নাম অতুলপ্রসাদ সেন। তিনি বাঙালির পঞ্চকবির অন্যতম একজন। যিনি একাধারে কবি, গীতিকার এবং গায়ক হিসেবে সর্বজন সমাদৃত। তবে বাংলাভাষীদের কাছে অতুল প্রসাদ সেন একজন সঙ্গীতজ্ঞ ও সুরকার হিসেবেই বেশি পরিচত।
উনিশ শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত যারা বাংলা কাব্যগীতি রচনায় নিজেদের বিশেষত্ব প্রকাশ করতে সক্ষম হন, অতুল প্রসাদ ছিলেন তাদেরই একজন। তার অধিকাংশ গানে মৌলিকত্ব পরিলক্ষিত হয়; আর সে কারণেই তিনি বাংলা সঙ্গীত জগতে এক স্বতন্ত্র আসন লাভ করেছেন।
১৮৭১-এ ঢাকায় জন্ম, বাবা রামপ্রসাদ সেন ছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহভাজন। দেবেন্দ্রনাথই তাকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে সাহায্য করেন।
জন্মাবধি অতুলপ্রসাদ পেয়েছেন উনিশ শতকের সংস্কারমুক্ত খোলা একটা আকাশ। বাবা রামপ্রসাদ নববিধানের আর দাদু কালীনারায়ণ ভারতীয় ব্রাহ্মসমাজের সদস্য ছিলেন। কালীনারায়ণের কাছে আসতেন বহু দরিদ্র মানুষ। দানসামগ্রী যা কিছু শিশু অতুলের হাত দিয়ে দেওয়াতেন তার মাতামহ।
বাবা রামপ্রসাদের মৃত্যুর পর অতুলপ্রসাদের মা হেমন্তশশীর দ্বিতীয় বার বিয়ে হয় ব্রাহ্ম নেতা দুর্গামোহন দাশের সঙ্গে। সম্পর্কে সৎবাবা হলেও দুর্গামোহন অতুলপ্রসাদকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন।
১৮৯০ সালে ব্যারিস্টারি পড়তে ইংল্যান্ডে পাড়ি দিলেন বছর কুড়ির অতুল। কলকাতায় ফিরে হাইকোর্টে নাম লেখালেন, লর্ড সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন সিংহের ‘জুনিয়র’হিসেবে শুরু হল কর্মজীবন।
ব্যারিস্টারি পরীক্ষা পাশ করে তিনি দেশে ফিরলে বাবা-মা খুব খুশি হন।কিন্তু কিছুদিন পরেই মামাতো বোন হেমকুসুমকে বিয়ে করতে চাওয়ায় পারিবারিক জটিলতা শুরু হয়। অবশেষে স্কটল্যান্ডে গ্রেটনাগ্রিন গ্রামের গির্জায় গিয়ে সেখানকার নিয়মে বিয়ে করেন হেমকুসুম-অতুলপ্রসাদ দম্পতির।
শুরু হল তাদের নতুন জীবন। অতুলপ্রসাদ লখনৌতে গিয়ে কয়েকজন বন্ধুর সহযোগিতায় লখনৌ বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হয়ে প্র্যাকটিস শুরু করলেন লখনউ কোর্টে। উর্দু শিখলেন, বন্ধুত্ব হল শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে। প্রিয়দর্শন, সহাস্য মানুষটি অচিরেই প্রিয় হয়ে উঠলেন সবার।
গান ছিল তার প্রাণ। তার গান সম্পর্কে দিলীপকুমার রায় লিখেছেন, ‘আমাদের আগেকার যুগে ভক্তির গানে ফুলের মতন ফুটে উঠছিলেন চারজন কবি: দ্বিজেন্দ্রলাল, রবীন্দ্রনাথ, রজনীকান্ত ও অতুলপ্রসাদ। এদের মধ্যে অতুলপ্রসাদ সর্বকনিষ্ঠ তথা অনলংকৃত কবি... তার গান শুনতে শুনতে মনে হয়, দৈনন্দিন ঘরকন্নার মধ্য দিয়ে যেন একটি সরল উচ্ছ্বাসী কবি-হৃদয় নিজের মনের কথা বলে চলেছে তার আনন্দ বেদনা আশা-নিরাশার পসরা নিয়ে।’
তার গান-বাঁধার উপলক্ষগুলিও ছিলো মনে রাখার মতো। বিলেতে ইংরেজ গায়িকার গান শুনে লিখেছিলেন ‘প্রবাসী চল রে, দেশে চল।’ লোকমান্য তিলক কারারুদ্ধ হয়েছেন, দেশ জুড়ে চলছে প্রতিবাদ। অতুলপ্রসাদ সেদিন গাইলেন ‘কঠিন শাসনে করো মা শাসিত’। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথের নোবেলজয়ের পর অতুলপ্রসাদ রচনা করলেন, ‘মোদের গরব মোদের আশা’-র দুটি কলি: ‘বাজিয়ে রবি তোমার বীণে/ আনল মালা জগৎ জিনে...’
রবীন্দ্রনাথ অতুলপ্রসাদকে গভীরভাবে ভালবাসতেন। একবার শান্তিনিকেতনে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাকে গেয়ে শোনান, ‘মোর সন্ধ্যায় তুমি সুন্দরবেশে এসেছ, তোমায় করি গো নমস্কার...’। এর প্রত্যুত্তরে আবার অতুলপ্রসাদ গেয়ে শোনান, ‘ওগো আমার নবীন সাথী, ছিলে তুমি কোন বিমানে?’
১৮৯৬ সালে রবীন্দ্রনাথ গড়েছিলেন ‘খামখেয়ালী সভা’। সদস্য ছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল, মহারাজা জগদীন্দ্রনারায়ণ রায়, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লোকেন্দ্রনাথ পালিত... আরও অনেকে। অতুলপ্রসাদ ছিলেন এই সভার সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। নিয়ম আর সময়ের কোনও হিসাব মেনে চলতো না এই সভার সভ্যরা। গানবাজনা- সাহিত্য সবই হত মজার ঢঙে।
অতুলপ্রসাদের দাম্পত্যজীবন খুব বেশি সুখকর ছিলোনা বলেই জানা যায়। স্ত্রী হেমকুসুম লখনৌতেই দীর্ঘকাল আলাদা বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন। সৎবাবার মৃত্যুর পর অতুলপ্রসাদ তার মা হেমন্তশশীকে নিজের কাছে এনে রাখেন। তা নিয়েই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। এই দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদে গড়ায়।
তার গানগুলি অতুল প্রসাদের গান নামে বিশেষ ভাবে প্রতিষ্ঠিত। অতুলপ্রসাদ বাংলা গানে ঠুমরি ধারার প্রবর্তক। গীতিগুঞ্জ (১৯৩১) গ্রন্থে তার সমুদয় গান সংকলিত হয়। এই গ্রন্থের সর্বশেষ সংস্করণে (১৯৫৭) অনেকগুলি অপ্রকাশিত গান প্রকাশিত হয়। তার গানের সংখ্যা ২০৮টি। এর মধ্যে মাত্র ৫০-৬০টি গান গীত হিসেবে প্রাধান্য পায়।
তার রচিত ও গাওয়া গানগুলি প্রধানত স্বদেশীসঙ্গীত, ভক্তিগীতি ও প্রেমের গান এ তিন ধারায় বিভক্ত। যদিও তার জীবনের দুঃখ ও যন্ত্রণাগুলি গানের ভাষায় বাঙ্ময় মূর্তি ধারণ করেছিল।আর তাই অনেকেই বলেন, ‘বেদনা’ অতুলপ্রসাদের গানের প্রধান অবলম্বন। এজন্য তার অধিকাংশ গানই হয়ে উঠেছে করুণরস-প্রধান।
তার রচিত গজলের সংখ্যা মাত্র ৬-৭টি হলেও তিনিই বাংলা ভাষায় প্রথম গজল রচয়িতা। অতুলপ্রসাদ সেনের কয়েকটি বিখ্যাত গান হল- মিছে তুই ভাবিস মন, সবারে বাস রে ভালো,বঁধুয়া, নিঁদ নাহি আঁখিপাতে, একা মোর গানের তরী, কে আবার বাজায় বাঁশি, ক্রন্দসী পথচারিণী ইত্যাদি। তার রচিত দেশাত্মবোধক গানগুলির মধ্যে প্রসিদ্ধ উঠ গো ভারত-লক্ষ্মী, বলো বলো বলো সবে, হও ধরমেতে ধীর -ইত্যাদি।
তার ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা’ গানটি আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশেষ অণুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার পাওয়া উপলক্ষে ১৯১৩ সালে লেখা এই গানটিতে তিনি বাঙালি এবং বাংলা ভাষার প্রতি গভীর প্রেম ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এই মাতৃভাষাপ্রেমপূর্ণ সঙ্গীতটি বাঙালির প্রাণে আজও ভাষাপ্রেমে গভীর উদ্দীপনা সঞ্চার করে এবং গানটির আবেদন আজও অম্লান।
অতুলপ্রসাদের গানগুলি দেবতা, প্রকৃতি, স্বদেশ, মানব ও বিবিধ নামে পাঁচটি পর্যায়ে বিভক্ত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গানের বিশেষ গুণগ্রাহী ছিলেন। অতুলপ্রসাদী গান নামে পরিচিত এই ধারার একজন বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী হলেন কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়।
অতুলপ্রসাদ তার সমগ্র জীবনের উপার্জিত অর্থের বৃহদংশ স্থানীয় জনকল্যাণে ব্যয় করেন। বৃটিশ ভারতের লখনৌতে বসবাসকালে তিনি ১৯৩৪ সালের ২৬ আগস্ট মারা যান। সেখানেই তার শেষকৃত্য হয়।
তার শোকসভায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘তার দয়া, দান, দাক্ষিণ্য জানাবার লোক এ সভায় নেই। কারণ তারা অত্যন্ত গরীব, অখ্যাত-অজ্ঞাত-অজানা লোক। তারা যদি আসতে পারতেন, তাহলে বলতে পারতেন তাদের বিপদে কত নিঃশব্দে অতুলপ্রসাদ তাদের সাহায্য করেছেন।’