তারুণ্যের প্রতীক হয়ে বৈষম্যহীন ও সবার জন্য সমান একটা পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন ছুড়ে দেন। মৃত্যুর অর্ধ শতক পরও তিনি তাই বেঁচে আছেন লাখো মানুষের হৃদয়ে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়ছেন বলে কবিতাকে দূরে ঠেলে দেননি। কবিতা পছন্দ করতেন, নিজেও লিখতেন। অনেকে বলেন, কবিতা তাঁর মধ্যে রোমান্টিকতা, ভালোবাসা আর স্বপ্নের অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছিল। ১৯৬৭ সালে তাঁকে হত্যা করা হয়। এরপর তাঁর মরদেহ নিয়েও রহস্যময় ঘটনা ঘটে।
১৯৫৩ সালে তিনি চিকিৎসক হয়ে আরাম-আয়েশের জীবন ছেড়ে সবার জন্য সমান একটা পৃথিবী গড়ার লক্ষ্য পূরণে মাঠে নামেন। বিনা পয়সায় সেবা দিতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে চলে যান। সঙ্গী করেন, কিউবা থেকে কঙ্গো পর্যন্ত সমাজতন্ত্র কায়েমের স্বপ্ন।

পরের বছর চে জড়িয়ে পড়েন গুয়াতেমালার সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে। সেখান থেকে মেক্সিকো সিটিতে। আর এই মেক্সিকো সিটিতেই কিউবার বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রো ও তাঁর ভাই রাউল কাস্ত্রোর সঙ্গে দেখা হয়েছিল তাঁর। এই ত্রিরত্ন ও তাদের অনুসারী গেরিলাদের হাত ধরে কিউবায় বিপ্লব সফল হয় ১৯৫৯ সালের প্রথম দিনটিতে। মার্কিন সমর্থনপুষ্ট কিউবার স্বৈরশাসক বাতিস্তা ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যান। বিপ্লব-পরবর্তী কিউবার পুনর্গঠনে কাজ করতে থাকেন চে। আফ্রিকার কঙ্গো হয়ে লাতিন আমেরিকার দেশ বলিভিয়ায় যান। ১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর সেখানকার দুর্গম অরণ্যে সরকারি সেনাদের হাতে বন্দী হন। পরের দিন বন্দী অবস্থায় এক স্কুলঘরে গুলি চালিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়।
‘দ্য টাইমস’-এর প্রথম পাতায় একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, বলিভিয়ার সেনাবাহিনী প্রথমে ঘোষণা করেছিল যে তিনি সংঘর্ষে মারা গেছেন এবং তিনি স্বীকার করেছেন যে তিনি বলিভিয়ায় সাত মাসের গেরিলা প্রচারণা চালিয়েছেন এবং তাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
পরের দিন তাঁর মৃত্যুর কারণ আরও স্পষ্ট হয়ে গেল: ‘টাইমস’ জানিয়েছে, ‘আজ একটি মেডিকেল প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে রোবার আর্নেস্তো চে গুয়েভারা দক্ষিণ-পূর্ব জঙ্গলে ধরা পড়ার কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা পরে খুন হন।’
এরপর তাঁর মরদেহ নিয়েও রহস্যময় ঘটনা ঘটে। তাঁকে গোপনে একটি গণকবরে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। (পরিচয় প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে তাঁর হাত কেটে ফর্মালডিহাইড দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছিল।)

দ্বিতীয় দাফন
৩০ বছর পর, জন লি অ্যান্ডারসন যখন গুয়েভারার জীবনী লেখবেন বলে ঠিক করলেন, তাঁর কবরটি কোথায় সেটা জানা জরুরি হয়ে যায়। তখনই খুঁজে বের করা হয় তাঁর কবর এবং দ্বিতীয়বারের মতো কিউবায় পূর্ণ সম্মানের সঙ্গে তাঁর সমাহিতকরণের কাজ সম্পন্ন করা হয়।
এ পৃথিবীতে দেশে দেশে একদা বিপ্লব হয়েছিল। রাশিয়া থেকে শুরু করে কিউবা, পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশ, চীন, পূর্ব জার্মানি, উত্তর কোরিয়া, ভেনেজুয়েলা ইত্যাদি অনেক দেশ ছিল এ বিপ্লবের তালিকায়। কিন্তু আজ আর তেমন অবশিষ্ট নেই। কোথাও পুরোপুরি বিদায়, কোথাওবা টিকে আছে বিকৃতরূপে। কেন অবশিষ্ট নেই, এর জবাব আমরা কীভাবে দেব? বিপ্লবের অর্থ যদি হয় মনোজাগতিক পরিবর্তন, তাহলে এই মনোজাগতিক পরিবর্তনই ঘটেনি কোথাও। তবে এটাও ঠিক, বিপ্লব নেই কোথাও, কিন্তু চে গুয়েভারা ঠিকই আছেন সকলের হৃদয়ে।