ডিসেম্বর ৬, ২০২১, ০৮:০১ পিএম
“যে তৈল দিতে পারিবে, তাহার বিদ্যা না থাকিলেও সে প্রফেসর হইতে পারে”
এখানে ‘তৈল’ বলতে স্নেহ, ভালোবাসাকে ইঙ্গিত করেছেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রি। তিনি মনে করতেন, মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে দুনিয়ার সবকিছু জয় করা যায়। তিনি বলেছেন, “আমি তোমায় স্নেহ করি, তুমি আমায় স্নেহ কর, অর্থাৎ আমরা পরস্পরকে তৈল দিয়া থাকি। স্নেহ কী? যাহা স্নিগ্ধ বা ঠাণ্ডা করে তাহার নাম স্নেহ। তৈলের ন্যায় ঠাণ্ডা করিতে আর কীসে পারে!”
অবশ্য আজকাল ‘তৈল’ শব্দের মানে পাল্টে গেছে। মিথ্যা প্রশংসা বা লোক দেখানো স্তুতিকে আমরা তেল দেয়া বলি।
সমাজ ও পরিবেশের বাস্তবতায় ভাষার অর্থ এভাবেই পাল্টে যায়। তবে ‘মূল’ থেকে আমরা কখনও সরে আসতে পারিনা। সেখানে আমাদের বারবার ফিরে যেতে হয়। পাণ্ডিত্যের গভীরতা আর দূরদৃষ্টিতা দিয়ে যারা সমাজ, সংস্কৃতি, ভাষা তথা মানুষকে বিশ্লেষণ করেছেন আমরা তাদেরই অনুসারী হয়ে থাকি চিরকাল। হরপ্রসাদ শাস্ত্রিও তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব। যিনি যাপিত জীবনকে দেখেছেন অনেক গভীরভাবে।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রি
হরপ্রসাদ শাস্ত্রি চর্যাপদের আবিষ্কারক- এতটুকু জানার মধ্যেই থেমে আছে আজকের প্রজন্ম। অথচ কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন তা আমাদের পাঠ্যপুস্তকে কতটুকুই বা আছে!
হরপ্রসাদ শাস্ত্রি সত্যিকার অর্থেই একজন পণ্ডিত। তার কাজের ক্ষেত্র ছিল কয়েকটি ভাষার প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত, সহজপ্রাপ্য ও দুর্লভ পুঁথির জগৎ। তিনি পুঁথি সংগ্রহ করেছেন, প্রকাশ করেছেন, বিশ্লেষণমূলক বিবরণী তৈরি করেছেন। ফলে ভারতবিদ্যা আর বাংলাবিদ্যা—যুগপৎ এই দুই শাস্ত্রে তার বিকল্পহীন প্রতিষ্ঠা ঘটেছে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীই সম্ভবত ভারত আর বাংলার সাংস্কৃতিক-ভাষিক-নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস প্রণয়নের ক্ষেত্রে এককভাবে সবচেয়ে কৃতী ব্যক্তিত্ব।
তিনি প্রায় দশ হাজার পুঁথির বিবরণাত্মক সূচি প্রণয়ন করেন, যা এগারো খন্ডে প্রকাশিত হয়। রাজস্থান অঞ্চল থেকে তিনি ভাট ও চারণদের পুঁথি সংগ্রহ করেন। সংস্কৃত পুঁথি সন্ধানের সূত্রেই তার আগ্রহে প্রাচীন বাংলা পুঁথি সংগ্রহের কাজ শুরু হয় এবং এ বিষয়ে তাকে সাহায্য করেন দীনেশচন্দ্র সেন এবং মুনশি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। এশিয়াটিক সোসাইটির গবেষণা প্রকল্পের মধ্যে হরপ্রসাদই প্রথম ‘বাংলা পুঁথি সন্ধান ও বিবরণ প্রকাশ’ কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করেন।
আচার্য সুকুমার সেন জানাচ্ছেন, পশ্চিমা আর প্রাচ্যবিদ্যায় উঁচু মাপের পাণ্ডিত্যের ক্ষেত্রে সমকালীনদের মধ্যে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর তুলনা চলতে পারে কেবল কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্যের সঙ্গে। কিন্তু কৃষ্ণকমলের পাণ্ডিত্য ফলপ্রসূ হয়নি। অন্যদিকে হরপ্রসাদ সংস্কৃত কলেজ থেকে এমএ পাস করেই সংশ্লিষ্ট হয়েছিলেন সে কালের বিদ্যাচর্চার প্রধান ধারা প্রাচ্যবিদ্যার সঙ্গে। সারা জীবনের নিরলস সাধনায় এ ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে অতুলনীয় উচ্চাসনে উন্নীত করতে পেরেছিলেন।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কয়েকবার নেপাল গিয়েছিলেন, তল্লাশি চালিয়েছিলেন পুরোনো পুঁথির সম্ভাব্য আস্তানায়, সেটা আত্ম-আবিষ্কারের আকাঙ্ক্ষারই প্রকাশ। এ ধরনের এক অভিযানেই ১৯০৭ সালে তিনি খুঁজে পান চর্যাপদের পুঁথি। নেপালের রাজদরবার গ্রন্থাগার থেকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদ পুঁথিটি আবিষ্কার করেন, যা ১৯১৬ সালে প্রকাশিত হয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এটাই তার মহত্তম অর্জন। চর্যাপদকেন্দ্রিক দীর্ঘ গবেষণার যথার্থ পথনির্দেশ তিনি করতে পেরেছিলেন।
এ তো গেল অর্জনের কথা। হরপ্রসাদ শাস্ত্রি মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন তা জানতে হলে তার ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলোর ওপর আলো ফেলতে হবে। তিনি অত্যন্ত মানবিক মানুষ ছিলেন। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করতেন না। তিনি নিজে ব্রাহ্মণ ছিলেন। নিজের ব্রাহ্মণত্ব উপভোগ করতেন। অন্য ব্রাহ্মণরা কেবল ব্রাহ্মণ হিসেবেই যে শ্রদ্ধা আর ভক্তির অধিকারী, এ ব্যাপারেও তার সংশয় ছিল না। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন সমতায়। একারণে নিম্নবর্ণের মানুষ তাকে পরম শ্রদ্ধা করত।
হরপ্রসাদের লেখক জীবনের বিস্তার প্রায় ৫৫ বছর। তার সাহিত্য-জীবন বঙ্কিমযুগ থেকে রবীন্দ্রযুগ অবধি প্রসারিত। একটা সময়ের পরে বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যাদর্শ থেকে হরপ্রসাদ সরে আসেন। বঙ্কিমচন্দ্র সাহিত্যকে ধর্মপ্রচারের মাধ্যম করে তোলায় হরপ্রসাদ সরাসরি আপত্তি জানান। সংস্কৃত সাহিত্য, বিশেষভাবে কালিদাসের কাব্য-নাটকের মূল্যায়নে তার এই আধুনিক সাহিত্যরুচির যথার্থ পরিচয় মেলে।
জীবনে হরপ্রসাদ বহু বিদ্যাপ্রতিষ্ঠানের সম্মাননা পেয়েছেন, যার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য- ১৮৮৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আজীবন ফেলো মনোনয়ন; ১৮৯৮ সালে সরকারের দেওয়া সম্মান ‘মহামহোপাধ্যায়’ উপাধি।
১৯৩১ সালের ১৭ নভেম্বর না ফেরার দেশে চলে যান এই গুণী ব্যক্তি। বাংলা ভাষায় তার অসীম অবদান কখনই হারিয়ে যাবে না। আজ হরপ্রসাদ শাস্ত্রির জন্মদিবসে তার প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা।