‘বিষাদ সিন্ধু’কেও ছাড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

ডিসেম্বর ১৯, ২০২২, ০৩:১৭ পিএম

‘বিষাদ সিন্ধু’কেও ছাড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি

তিনি বরাবর বিতর্কিত এবং তার চরিত্রের প্রধান দিক হচ্ছে-সমকালের থেকে এগিয়ে থাকা। জমিদার বংশে জন্ম হলেও কলম ধরেছেন লম্পট, অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে। তাদের মুখোশ খুলে দিতে। মুসলমান হলেও তিনি শক্ত হাতে কলম ধরেছেন মুসলমানদের গোমাংস খাওয়ার বিরুদ্ধে। জাত-পাত ও ধর্মীয় মৌলবাদকে জীবনেও প্রশ্রয় দেননি কখনও। তাকে বলা হয়ে থাকে মুসলিম রচিত আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সমন্বয়ধর্মী ধারার প্রবর্তক, একই সাথে হিন্দু-মুসলিম মিলনের অগ্রদূত। তিনি মীর মশাররফ হোসেন- বাংলা গদ্য সাহিত্যের বিশিষ্ট লেখক,মুসলিম বাংলা সাহিত্যের অগ্রপথিক।

মীর মোশাররফ হেসেন তাঁর বহুমুখী প্রতিভার মাধ্যমে উপন্যাস, নাটক, প্রহসন, কাব্য ও প্রবন্ধ রচনা করে আধুনিক যুগে মুসলিম রচিত বাংলা সাহিত্যে সমৃদ্ধ ধারার প্রবর্তন করেন। তাঁর আগে কোনো মুসলমান সাহিত্যিকই এত বিপুলভাবে সাহিত্যক্ষেত্রে অগ্রসর হননি। তিনি সাহিত্যের সকল শাখায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। কাঙ্গাল হরিনাথের অন্যতম প্রধান এই শিষ্য বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন সাহিত্যরস সমৃদ্ধ গ্রন্থ রচনায়।

উনিশ আর বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব মীর মোশাররফ হোসেন ১৮৪৭ সালেল ১৩ নভেম্বর বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার লাহিনীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নবাব সৈয়দ মীর মোয়াজ্জেম হোসেন (মুসলিম সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, তৎকালীন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর লাহিনী পাড়ার জমিদার) এবং দৌলতুন্নেছার এই সন্তানটির

প্রথাগত ডিগ্রি না জুটলেও নানা অভিজ্ঞতা তাঁকে কৈশোরেই ঋদ্ধ করে তুলেছিল। আরবি-ফারসিতে ভাল দখল ছিল। ইংরেজিটা আয়ত্ব করেছিলেন কুষ্টিয়া আর পদমদীর স্কুলে। আর জগমোহন নন্দীর পাঠশালায় বাংলার প্রতি প্রথম প্রেম ও ভালবাসা জন্মায় মীর মোশাররফ হোসেনের।

জমিদার বংশের সন্তান হওয়ায় বাড়িতে বিলাস ও ভোগের উপকরণে ঘাটতি ছিল না। তবে কিশোর বয়সে মীর মোশাররফ যুবতী এক দাসীর প্রেমে পড়ে যান। স্বীকারও করেছেন ওই যুবতী পরিচারিকার সঙ্গে সম্পর্কের কথা-‘প্রতিজ্ঞা করিয়াছি সত্য কথা বলিব। দাসী, বান্দি কর্তৃকই আমার চরিত্র প্রথম কলঙ্ক রেখায় কলঙ্কিত হয়।’

হয়তো এ ভাবেই ভোগবিলাসে ভেসে যেতেন মীর মোশাররফ। তবে বাংলা সাহিত্য যার স্পর্শে আরও সমৃদ্ধশালী হওয়ার অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছে তিনি কী এভাবে ভেসে যেতে পারেন? তাই হয়তো কিছুকাল পর বাবা মোয়াজ্জেম বিষয়টি জানতে পেরে কিশোর মোশাররফকে নিয়ে লাহিনীপাড়া ছেড়ে চলে যান ফরিদপুরের পদমদী।

কবি হতে চেয়েছিলেন মীর মোশাররফ হোসেন। কৈশোরে ছড়া ও কবিতা লিখলেও কৈশোর-যৌবনের সন্ধিতে এসে মশাররফ শ্বাস ফেলেন গদ্য-গগনে। ‘সংবাদ প্রভাকর’ এবং ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’-র পাতায় শুরু হয় তার গদ্যচর্চা। কখনও প্রতিবেদন, কখনও প্রবন্ধ।

মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৮৬৫ সালে ইচ্ছের বিরুদ্ধে ও চক্রান্তের শিকার হয়ে আজিজুন্নেসার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। পরবর্তীতে সম্পর্ক ছেদ করে  ১৮৭৪ সালে তিনি বিয়ে করেন কুলসুমকে। মোশাররফ তখন ২৬ আর কুলসুমের বয়স ১২। কুলসুম ছিলেন তাঁর যথার্থ সহধর্মিণী ও তাঁর লেখার প্রেরণার উৎস। ‘আমার জীবনীর জীবনী কুলসুম জীবনী’ বইটি তারেই প্রমাণ বহন করে। আর নিজের স্ত্রীকে নিয়ে লেখা ১৯১০ সালে প্রকাশিত ওই বইটিই ছিল তাঁর শেষ বই।

১৮৬৯ সালে মীর মোশাররফ হোসেনের প্রথম গদ্যগ্রন্থ ‘রত্নবতী’ প্রকাশিত হয়। রূপকথা জাতীয় গল্পের এই বইটি তেমন সাফল্য না পেলেও ১৮৭৩ সালে প্রকাশিত ‘জমিদার দর্পণ’ নাটক তাঁকে ব্যাপক খ্যাতি এনে দেয়। জমিদার হায়ওয়ান আলি নামে এ দেশের এক অত্যাচারীর দুষ্কর্ম, প্রজাপীড়ন, লাম্পট্যের কথা আছে নাটকটিতে।

১৮৭২-৭৩ সালে সিরাজগঞ্জে সংঘটিত কৃষক-বিদ্রোহের পটভূমিকায় রচিত এই নাটকের ভূমিকায় মীর মোশাররফ লিখেছেন, ‘নিরপেক্ষভাবে আপন মুখ দর্পণে দেখিলে যেমন ভালমন্দ বিচার করা যায়, পরের মুখে তত ভাল হয় না। জমিদার বংশে আমার জন্ম, আত্মীয়-স্বজন সকলেই জমিদার, সুতরাং জমিদারের ছবি অঙ্কিত করিতে বিশেষ আয়াস আবশ্যক করে না।’

নাটক রচয়িতার প্রশংসা করেছিলেন বাংলা উপন‍্যাসের জনক এবং বাংলা সাহিত্যের সাহিত্য সম্রাট হিসেবে পরিচিত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় জমিদার দর্পণ’ নাটকের প্রশংসা করে তিনি লিখেছেন, ‘জনৈক কৃতবিদ্য মুসলমান কর্তৃক এই নাটকখানি বিশুদ্ধ বাঙ্গালা ভাষায় প্রণীত হইয়াছে। মুসলমানি বাঙ্গালার চিহ্নমাত্র ইহাতে নাই। বরং অনেক হিন্দুর প্রণীত বাঙ্গালার অপেক্ষা এই মুসলমান লেখকের বাঙ্গালা পরিশুদ্ধ।…আমাদিগের বলা কর্তব্য যে নাটকখানি অনেকাংশে ভাল হইয়াছে।’

মুসলমান হয়েও মীর মোশাররিফ ছিলেন গোমংস খাওয়ার বিরোধী। ১৮৮৯ সালে ‘গো-জীবন’ নামে তাঁর ‘বিতর্কিত’ রচনাটি প্রকাশিত হয়।

গো-জীবন-এ মীর মোশাররফ লিখেছেন, ‘আমি মোসলমান— গোজাতির পরম শত্রু। আমি গোমাংস হজম করিতে পারি। পালিয়া, পুষিয়া বড় বলদটির গলায় ছুরি বসাইতে পারি, ধর্মের দোহাই দিয়া… পোড়া উদর পরিপোষণ করিতে পারি… কিন্তু শাস্ত্রে একথা লিখা নাই যে, গো-হাড় কামড়াইতেই হইবে, গোমাংস গলাধ করিতেই হইবে, না করিলে নরকে পচিতে হইবে।’

মূলত উপমহাদেশে গোরু কোরবানি নিয়ে হিন্দু মুসলমানের যে বিপরীতধর্মী অবস্থান, তার ব্যাপারে মন্তব্য রাখেন মীর মোশাররফ। তাঁর মত ছিল, গোরু কুরবানির বদলে অন্য কিছু ( যেমনঃ ছাগল) কুরবানি দেওয়ার।

"খাদ্য সম্বন্ধে বিধি আছে যে খাওয়া যাইতে পারে-খাইতেই হইবে, গো-মাংস না খাইলে মোসলমান থাকিবে না, মহাপাপী হইয়া নরকযন্ত্রণা ভোগ করিতে হইছে….একথা কোথাও লিখা নাই।"

এই প্রবন্ধ লেখার পর মীর মোশারাফ হোসেনকে কম যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়নি। প্রবল নিন্দার সম্মুখীন হন তিনি। তাঁর নামে ফতোয়া জারি হয়। ধর্মসভা ডেকে তাঁকে কাফের এবং তাঁর স্ত্রীকে হারাম জারি করা হয়। তাঁকে 'তওবা' করতেও বলা হয়েছিল।

এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মীর মোশাররফ প্রথমে একটি মামলা দায়ের করলেও পরে ব্যাপারটি আপসে মিটিয়ে নেন। কিন্তু গো-জীবন এর পরবর্তীকালে আর ছাপা হয়নি।

বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম ঔপন্যাসিক মীর মোশাররফ হোসেনের অমর সৃষ্টি ‘বিষাদ সিন্ধু’ বঙ্কিমযুগের অন্যতম প্রধান গদ্যশিল্পী মীর মোশাররফের খ্যাতি মূলত ইতিহাস আশ্রিত এই গ্রন্থটির জন্যই।বাংলা গদ্য সাহিত্যের এই কালজয়ী লেখক ১৯১২ সালের ১৯ ডিসেম্বর দেলদুয়ার এস্টেটে ম্যানেজার থাকাকাল মৃত্যুবরণ করেন।

মীর মোশাররফ হোসেনের আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’, ব্যঙ্গরচনা ‘গাজী মিয়ার বস্তানী’, পাঠ্য বই ‘মুসলমানের বাঙ্গালা শিক্ষা’ আজও উল্লেখের অপেক্ষা রাখে। তিনি অনেক ধর্ম-বিষয়ক বইও লিখেছেন। মীর মোশাররফ চলে গেছেন না ফেরার দেশে, তবে ১৮৬৯ থেকে ১৯১০ পর্যন্ত চার দশক জুড়ে ৩৫টি বই আর পত্রিকার পাতায় ছড়ানো একাধিক লেখায় তিনি যেন সচল-সবাক আছেন আজও।

Link copied!