ইলা মিত্র, সংগ্রাম, জনস্বার্থ সংরক্ষণ, নেতৃত্ব এবং তেভাগা কৃষক আন্দোলন এগুলো যেন একেকটা একেকটার পরিপূরক। ইতিহাসের এই ঘটনা এবং চরিত্রগুলোকে একসঙ্গে পাঠ করতে হয়। নইলে ইতিহসের ফাঁক গলে চলে যায় অনেক কিছু।
ইলা মিত্রের জীবন পাঠকের কাছ থেকে একচ্ছত্র মনোযোগ দাবী করে। কেননা ইলা মিত্র এমন একজন নারী যিনি আমৃত্যু মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করে গেছেন। আর এসব জনহিতৈষী কাজের মূল্য তাকে দিতে হয়েছে নিজের শরীরের অবমাননা হতে দিয়ে, নিজের সন্তান, পরিবারের কাছ থেকে ৮ বছর আলাদা থেকে। তবে পিছপা হননি তিনি। জীবনে যে ব্যক্তি মানুষের মুক্তি আন্দোলনের হাল ধরেছেন তার জীবিন বিপথে যাবে বা হারিয়ে যাবে তা তো হতে পারেনা। ইলা মিত্রও হারিয়ে যাননি। বারবার ফিরে এসেছেন নতুন করে, নব উদ্যমে।
১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি। পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে আসছেন তিনি, সাঁওতাল রমণীর ছদ্মবেশে। সীমানা পেরোনোর আগেই, রোহনপুর রেল স্টেশনে ধরা পড়ে গেলেন পুলিশের হাতে। নিয়ে আসা হল নাচোল স্টেশনে। তারপর টানা চারদিন অকথ্য নির্যাতন পুলিশের। বুটের আঘাত, নগ্ন করে প্রহার, খেতে না দেওয়া, ধর্ষণ–বাদ গেল না কিছুই। এসবই স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা। তবু মুখ খুললেন না তিনি। সহ্য করলেন যাবতীয় পাশবিক অত্যাচার। তিনি, ইলা মিত্র। পূর্ব পাকিস্তানে কৃষক সংগ্রামের নেত্রী। নির্যাতনের চোটে হরেক শেষ পর্যন্ত মরে গিয়েছে তবুও বলেনি যে ইলা মিত্র, তার স্বামী রমেন্দ্র মিত্র এবং সাওতাল নেতা মাতলা মাঝি নাচোলের একটি গ্রামে পুলিশ হত্যার হুকুম দিয়েছেন। কেউই স্বীকার করেনি। তাই এবার ধরা হলো ইলা মিত্রকে। তৎকালীন পাকিস্তানী পুলিশ প্রথমে ইলা মিত্রের পায়ের গোড়ালী দিয়ে রড ঢুকিয়ে দেয়। ভয়াবহ রক্তপাতের পরও ইলা মিত্র মুখ খোলেননি।
এর পরের গল্প ইলা মিত্রের নিজের জবানীতেই শোনা যাক। সত্যেন সেন লিখিত ‘বাংলাদেশের কৃষক আন্দোলন’ বইতে ইলা মিত্রের জবানীতেই ইলা মিত্র কিরূপ নির্যাতনের স্বীকার হয়েছিলেন তার উল্লেখ আছে। ইলা মিত্র বলছেন, ‘…হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে সবকিছু স্বীকার না করলে আমাকে উলঙ্গ করে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেওয়া হবে এই বলে এস.আই আমাকে হুমকি দেখায়। আমার যেহেতু বলার মতো কিছু ছিল না, তাই তারা আমার সমস্ত কাপড়চোপড় খুলে নেয় এবং সম্পূর্ণ উলঙ্গভাবে আমাকে সেলের মধ্যে বন্দী করে রাখে’। তবে নির্যাতন এখানেই শেষ নয় বরং কেবল শুরু বলা যায়। সেদিন সন্ধ্যা বেলায়ই সেলের ভেতরে এস আইয়ের উপস্থিতিতে সিপাহীরা ইলা মিত্রকে বন্দুকের বাট দিয়ে আঘাত করে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে। সারাদিন তাকে কিছু খেতে দেওয়া হয়নি। ফলে উলঙ্গ শরীরে বন্দুকের বাটের আঘাতে তার শরীর থেকে দরদর করে রক্ত পড়তে থাকে। তারপরও ক্ষান্ত হয়নি পুলিশ। যাওয়ার সময় বলে দিয়ে যায় এরপরও যদি ইলা মিত্র স্বীকার না করেন তাহলে তাকে ধর্ষণ করা হবে। নাচোল থানার পুলিশ কেবল এই হুমকি দিয়েই থেমে থাকেনি। পরদিন তাকে ধর্ষণও করে পুলিশ। ধর্ষণের আগে তার ওপর আরো নির্যাতন করা হয়েছিল। তার দু পা দুটি বাশের মধ্যে রেখে বাঁশ চাপা দেওয়া হতো। কেবল তাই নয়, নির্যাতনের এক পর্যায়ে ইলা মিত্রকে ভায়বহ যৌন নির্যাতন করা হয়। নির্মম এই নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে ইলা মিত্র বলেন, ‘সেলের মধ্যে এস আই আবার সেপাইদের চারটে গরম সেদ্ধ ডিম আনতে বলে দিয়ে দিল এবং বললো, ‘এইবার সে কথা বলবে’। তারপর চারপাঁচজন সেপাই আমাকে জোরপূর্বক ধরে চীৎ করে শুইয়ে রাখলো এবং একজন আমার সঙ্গে চরম বর্বর আচরণ করে….এরপর আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি’।
বর্বরতরা বা নির্মমতা যদি এখানেই শেষ হতো! কিন্তু তা হয়নি। এরপর তাকে রীতিমতো ধর্ষণ করে নাচোল পুলিশ স্টেশনের এক সেপাই। ইলা মিত্র বলছেন, ‘…গভীর রাতে এস আই এবং সেপাইরা আবার ফিরে এল এবং তারা আবারো সেই হুমকি দিল। কিন্তু আমি তখনো কিছু বলতে রাজি হলাম না তখন তিন চারজন আমাকে ধরে রাখলো এবং একজন সেপাই সত্যি সত্যি আমাকে ধর্ষণ করতে শুরু করলো। এর অল্প পরেই আমি অজ্ঞান হয়ে পড়লাম’।
ইতিহাসের এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলো বলার মানে কোন গল্প বা সহানুভূতি অর্জন নয়, স্রেফ একজন ইলা মিত্র আসলে কতোটা ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন কৃষক অধিকার আদায় করতে গিয়ে তার একটা ছোট্ট একটা খসড়া আঁকা। জীবনে ইলা মিত্র কিভাবে সামলে নিয়ে জীবনকে এগিয়ে নিয়েছেন তার একটি প্রামাণ্য দলিল এসব ঘটনা। ইলা এমনি এমনি ইলা হয়ে ওঠেননি। ইলার ইলা মিত্র হয়ে ওঠার জন্য রক্তপণ দিতে হয়েছে।
১৯৫০ সালেই তেভাগা আন্দোলন স্তিমিতি হয়ে পড়লে ইলামিত্র কোলকাতা চলে যান। তারপর সেখানে এম এ পরীক্ষা দিয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন সিটি কলেজে। তবে সেখানেই থেমে থাকেননি। রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন আমৃত্যু। ১৯৬২ থেকে ১৯৭৮ পর্যন্ত টানা চার মেয়াদে পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভার সদস্য ছিলেন।
শেখ হাসিনা প্রথমবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ইলা মিত্র বাংলাদেশ সফরে এলে তার সঙ্গে দেখা করেন। সেসময় বাংলাদেশের নারী উন্নয়নে পদক্ষেপ নিতে তিনি শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানান। এসময় ইলা মিত্র শেখ হাসিনাকে ১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান সরকার কর্র্তক তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা তুলে নিতে বলেন। শেখ হাসিনা সেসময় তাকে বলেছিলেন, সেই পুরনো আমলে নথি এখনো আছে নাক? কোথায় হারিয়ে গেছে কে জানে। শেখ হাসিনা তখন ঠাট্টা করে বলেন, আপনি (ইলা মিত্র) কি চান পূরব পাকিস্তান সরকারের মতো আমরাও আপনাকে আত্মসমর্পনের নোটিশ দেই? এই বলে তারা দুজন হেসে ওঠেন।
প্রথম নারী হিসেবে কোন ভারতীয় বাঙালী নারী ১৯৪০ সালের জাপান অলিম্পিকে চান্স পেয়েছিলেন? তিনি আর কেউ নন। ইলা মিত্র। দূর্দান্ত স্পোর্টসম্যাস ছিলেন তিনি। কেবল খেলায় নয় জীবনের কোন ক্ষেত্রেই পিছিয়ে ছিলেন না। একজন পরিপূর্ণ মানুষ ছিলেন তিনি। পড়ালেখা, খেলাধুলা, রাজনীতি, নেতৃত্ব, কোথায় পিছিয়ে ছিলেন তিনি? কোথাও না।
১৮ অক্টোবর, ১৯২৫-১৩ অক্টোবর, ২০০২ জীবনকালে যেখানেই গেছেন সেখানেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়েছেন তিনি। একজন ইলা মিত্রের অভাব অন্য কাউকে দিয়ে পূরণ হবার নয়। ইলা মিত্ররাই আমাদের মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। তার সংগ্রামী সত্ত্বা নারী ও মানব মুক্তির সংগ্রামে আজকের যারা অংশীদার তাদের পথ দেখাবে।