পাক সার জমিন সাদ বাদ স্রষ্টার জন্মদিন

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

এপ্রিল ২৮, ২০২১, ০১:৪৬ পিএম

পাক সার জমিন সাদ বাদ স্রষ্টার জন্মদিন

আজ ২৮ এপ্রিল। বাংলাদেশের অন্যতম প্রথাবিরোধী এবং বহুমাত্রিক লেখক ড. হুমায়ুন আজাদের জন্মদিন। ১৯৪৭ সালের এই দিনে তিনি বর্তমানে মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্ম নাম ছিল হুমায়ুন কবীর। ১৯৮৮ সালে ২৮ সেপ্টেম্বর নাম পরিবর্তনের মাধ্যম হয়ে যান হুমায়ুন আজাদ।

১৯৬৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ও পরের বছর একই বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। উভয় পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন।

১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে ২২ বছর বয়সে তার কর্মজীবন শুরু হয় চট্টগ্রাম কলেজে প্রভাষক  হিসেবে। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গিরনগর বিশ্বাবদ্যালয় ও সবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।১৯৭৬ সালে তিনি স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

বাংলাদেশের এই শিক্ষাবিদ প্রথাবিরোধী লেখার জন্য ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ধর্ম, মৌলবাদ, প্রতিষ্ঠান ও সংস্কারবিরোধীতা, যৌনতা, নারীবাদ ও রাজনীতি বিষয়ে তার বক্তব্যের জন্য ৮০ এর দশক থেকে পাঠকগোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কবি, ঔপন্যাসিক, ভাষাবিজ্ঞানী, সমালোচক, রাজনীতিক ভাষ্যকার, গবেষক, অধ্যাপক নানা পরিচয়ে তিনি বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন।

হুমায়ুন আজাদ প্রথাগত ধ্যানধারা সচেতনভাবে পরিহার করতেন। তার সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য পল্লীপ্রেম, নর-নারীরপ্রেম, প্রগতিবাদিতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা, সামরিক শাসন ও একনায়কতন্ত্রের বিরোধিতা ও নারীবাদের জন্য পরিচিত। তার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত অভীষ্ট তার সাহিত্যকে প্রভাবান্বিত করেছিল।

হুমায়ুন আজাদের সাতটি কাব্যগ্রন্থ, ১২টি উপন্যাস ও ২২টি সমালোচনা গ্রন্থ, সাতটি ভাষাবিজ্ঞানবিষয়ক, আটটি কিশোরসাহিত্য ও অন্যান্য প্রবন্ধসংকলন মিলিয়ে ৬০টিরও অধিক গ্রন্থ তার জীবদ্দশায় এবং মৃত্যু পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হয়। 

২০০৩ সালে ইত্তেফাক পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় হুমায়ুন আজাদের পাক সার জমিন সাদ বাদ উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল। ২০০৪-এর একুশে বইমেলাতে উপন্যাসটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হলে দেশের মৌলবাদী গোষ্ঠী তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয় এবং বিভিন্ন স্থানে হুমায়ুন আজাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালায়। তিনি এই বইটিতে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীকে ফ্যাসিবাদী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করেন পরোক্ষভাবে এবং এর কঠোর সমালোচনা করেন। তারই জের ধরে ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত বইমেলা থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজের বাসায় যাওয়ার পথে ঘাতকদের দ্বারা আক্রমণের শিকার হন তিনি। প্রথমে বাংলাদেশের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, ঢাকাতে এবং পরে থাইল্যান্ডে নিবিড় চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি কিছুটা সুস্থ হন। জামাত-উল-মুজাহিদীন বাংলাদেশ সংক্ষেপে জেএমবি নামক ইসলামি জঙ্গী সংগঠনের একজন শীর্ষনেতা শায়খ আব্দুর রহমান পরবর্তীতে হুমায়ুন আজাদ এবং একইসাথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম ইউনুসকে হত্যার নির্দেশ দেবার কথা স্বীকার করে। 

২০০৪ সালের ৭ আগস্টে জার্মান কবি হাইনরিখ হাইনের ওপর গবেষণা বৃত্তি নিয়ে ড. হুমায়ুন আজাদ জার্মানি যান। একই বছরের ১১ আগস্ট রাতে একটি অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পর আবাসস্থলে আকস্মিকভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বাংলাদেশের এই বহুমাত্রিক লেখক। পরের দিন আবাসস্থলের নিজকক্ষে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। 

হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর পর জার্মান সরকারের তত্ত্বাবধানে মিউনিখে তার নিজ বাসভবনে পাওয়া সব জিনিসপত্র ঢাকায় তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। ওই জিনিসপত্রের ভেতরেই পাওয়া যায় তার হাতের লেখা তিনটি চিঠি। চিঠি তিনটি আলাদা তিনটি পোস্ট কার্ডে লিখেছেন বড় মেয়ে মৌলিকে, ছোট মেয়ে স্মিতাকে এবং একমাত্র ছেলে অনন্য আজাদকে। অনুমান করা হয়, ওই লেখার অক্ষরগুলোই ছিল তার জীবনের শেষ লেখা। তার মরদেহ কফিনে করে জার্মানি থেকে ঢাকায় আনা হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাযার নামাজ শেষে তার মরদেহ রাড়িখালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয় এবং পরে তার কবর সিমেন্ট দিয়ে পাকা করে একটি বইয়ের মত করে বানানো হয়।

বাংলাভাষা ও সাহিত্যে অসামন্য অবদানের জন্য ড.হুমায়ুন আজাদ, বাংলা একাডেমি পুরুষ্কার, একুশে পদকসহ (মরণোত্তর) নানা পুরুষ্কারে ভূষিত হয়েছেন।

Link copied!