আজীবন সংগ্রামী এক শিল্পী। একাধারে ছিলেন গীতিকার, সুরকার, গায়ক ও গিটারবাদক। সারাজীবন গেয়েছেন জীবনঘনিষ্ঠ গান। আর তাই পেয়েছেন আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয়তা। তার গানে থাকতো মানবতার কথা, সামাজিক ন্যায় আর সুবিচারের কথা। আপন মহিমায় আজও তিনি অসম্ভব জনপ্রিয় শিল্পী। তিনি বব মার্লে-তৃতীয় বিশ্ব থেকে উঠে আসা এক কিংবদন্তী সুপারস্টার।

বব মার্লে গেয়েছেন এবং তৈরি করেছেন রেগি, স্কা, রক স্টেডিসহ নানা ধরনের মৌলিক এবং মিশ্র সঙ্গীত। জ্যামাইকান সঙ্গীতকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়া বব মার্লে ছিলেন গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী। নান্দনিক সুরের মুর্ছনায় শ্রোতা-দর্শকদের মাতিয়ে রাখার এক যাদুকরী ক্ষমতা ছিল বব মার্লের। তার গানে শ্রোতারা তাদের দুঃখ কষ্ট কিছুক্ষণের ভুলে গিয়ে সুরের তালে নেচে উঠতো।
বিন্যস্ত জটাধারী চুলের মার্লে সবসময় মানবতার পক্ষে, নিপীড়িত আর খেটে খাওয়া মানুষের জন্য গান গাইতেন। ববের গানে ছিল অত্যাচার, শোষণ আর বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে কালোদের ওপর চালানো বর্ণবাদী নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁতভাঙ্গা জবাব। তার গান ছিল শোষণের বিরুদ্ধে শোষিতের ডাইরেক্ট অ্যাকশন আর অত্যাচারীর বিরুদ্ধে অত্যাচারিত’র রুখে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার। রাজনৈতিক আগ্রাসন আর পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদও ছিল বব মার্লের গানে।

১৯৪৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ জ্যামাইকাতে জন্ম নেওয়া এই ক্ষণজন্মা শিল্পী মাত্র ১২ বছর বয়সেই মঞ্চে গাওয়া শুরু করেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ব্যান্ডদল গঠন করেছিলেন মার্লে। এরপর কখনো দলের হয়ে আবার কখনো এককভাবেই গানের অ্যালবাম বের করেছেন।
১৯৭৩ সালের শেষের দিকে ‘বার্নিন’ শিরোনামে একটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। এ ‘আই শট দ্য শেরিফ’ গানটির কভার করেন এরিক ক্ল্যাপটন। এই গানটাই ববের প্রথম ইউএস হিট হিসাবে গণ্য হয়। চারিদিকে বব মার্লের নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে। অ্যালবামটিতে আরেকটি গান ছিল ‘গেট আপ অ্যান্ড স্ট্যান্ড আপ’। এই গানটি ষাট ও সত্তরের দশকে দেশে দেশে উত্তাল জাতীয়তাবাদী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনে বিদ্রোহী মানুষদের বুকে সাহস জুগিয়েছে এ গান।

নিজ দেশের রাজনৈতিক সংঘাত মেটাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। শান্তির জন্য কয়েকটি কনসার্ট করেছেন তিনি জ্যামাইকায়। তিনি ‘ওয়ান লাভ পিস কনসার্ট’ আয়োজন করেন, যেখানে জ্যামাইকার দুইটি লড়াইরত রাজনৈতিক পার্টির দুই প্রধানকে তিনি এক মঞ্চে নিয়ে আসেন। জ্যমাইকাসহ আফ্রিকানদের কল্যাণে তিনি চিন্তা করেছেন সবসময়।
১৯৬৬ সালে রিটা অ্যান্ডারসনকে বিয়ে করার পরই বদলে যান বব মার্লে। ঝুঁকে পড়েন রাস্তাফারি বিশ্বাসের দিকে। ওই বিশ্বাস অনুযায়ী লম্বা জটাযুক্ত ঝুঁটি) করা শুরু করেন। বব মার্লের আফ্রিকানিজম, রাজনৈতিক প্রগতিশীলতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং জীবনাচরণ সবই ছিল রাস্তাফারিয়ান বিশ্বাস থেকে উঠে আসা। একারণে চামড়ার ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেও ডাক্তাররা যখন তার পায়ের আঙুল কেটে ফেলার পরামর্শ দেন, তখন তিনি না বলে দেন। কারণ রাস্তাফারিয়ান বিশ্বাসে তা করার অনুমোদন নেই।

অসম্ভব সংগীত পাগল ছিলেন বব মার্লে। তিনি বলতেন, ‘সংগীতের সবচেয়ে বড় গুন হচ্ছে, যখন এটা আপনার মনে ধরবে, আপনি আর কোন ব্যাথা অনুভব করবেন না।”ভালবাসা’র একটা অমর ব্যাখ্যা দিয়েছেন বব মার্লে। তা হলো- “তুমি বল, বৃষ্টি তোমার ভালো লাগে, কিন্তু ভিজে যাবার ভয়ে ছাতা ধর। তাই তুমি যখন আমাকে বলো আমাকে ভালোবাসো, আমার ভয় হয় তখন।”
মার্লে প্রচণ্ড রকম গাঁজায় আসক্ত ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, যখন লোকজন গাঁজার ধোঁয়া টান দেয়। তখন তার মস্তিষ্ক কল্পনার রাজ্যে ভেসে বেড়ায়। সম্প্রতি তার নামে গাজার একটি ব্রান্ডও আছে। ‘মার্লে ন্যাচারাল’ নামে এই ব্র্যান্ডের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে পাওয়া যায় গাঁজাযুক্ত প্রসাধনী সামগ্রী। বব মার্লের কন্যা সিডেলা মার্লে এবিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, বাবা বেঁচে থাকলে এই উদ্যোগকে অবশ্যই স্বাগত জানাতেন। মানুষ যে শেষ পর্যন্ত গাঁজার নিরাময়ী ক্ষমতা সম্পর্কে বুঝতে শুরু করেছে- আমার বাবা বেঁচে থাকলে খুবই খুশি হতেন এটা জেনে।”

১৯৮০ সালে সফলতার চূড়ায় থাকার সময় বব মার্লে যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক শো করেন। নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে জগিং করতে করতে পড়ে গেলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার আগেই সনাক্ত হওয়া ক্যান্সার মস্তিষ্কসহ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। মিয়ামির একটি হাসপাতালে ১৯৮১ সালের এই দিনে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে চলে যান না ফেরার দেশে।