বাঙালির ইতিহাস পুনর্গঠনের অগ্রদূত অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

মার্চ ১, ২০২১, ১১:৫৬ এএম

বাঙালির ইতিহাস পুনর্গঠনের অগ্রদূত অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

বাংলার ইতিহাসচর্চায় যে কজন বাঙালির নাম আসবে, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়। কিন্তু সময়ের আবর্তনে তার নাম যেন খানিক চাপাই পড়ে গেছে। একদিকে যেমন দক্ষ হাতে সামলেছেন ওকালতি, অন্যদিকে নিজের মতো করে চালিয়ে গেছেন সাহিত্য, গবেষেণা ও লেখালেখির কাজ। তাৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার সংস্কারেও তার অবদান উল্লেখযোগ্য।

প্রখ্যাত এ ইতিহাসবিদ ও লেখকের জন্মও রাবীন্দ্র-নজরুলের যুগে। তিনি বয়সেও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে মাত্র মাস দুয়েক বড় ছিলেন। অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় ১৮৬১ সালের ১ মার্চ নদীয়ার জেলার (বর্তমান কুষ্টিয়া) মিরপুর থানার শিমুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পড়াশোনায় হাতেখড়ি ঘটে কুমারখালীর স্থানীয় শিক্ষক হরিনাথ মজুমদারের কাছে, যাকে বাংলার ইতিহাসে সবাই ‘কাঙাল হরিনাথ’ নামেই বেশি চেনেন।

দশ বছর বয়সে মৈত্রেয় রাজশাহীতে তার বাবার কাছে চলে যান। বাবা মথুরানাথ মৈত্রেয় রাজশাহীতে ওকালতি করতেন। মৈত্রেয় তৎকালীন বোয়ালিয়া ইংলিশ স্কুল (বর্তমানে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল) থকে ১৮৭৮ সালে এনট্রান্স পাশ করেন এবং ১৮৮০ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে এফএ পাশ করেন। ১৮৮৩ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ এবং ১৮৮৬ সালে আবার রাজশাহী কলেজ থেকে বিএল পাশ করেন। একই বছর তিনি রাজশাহীতে আইন পেশা শুরু করেন।

ইতিহাস শুধুমাত্র কিছু কল্পকথার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় না। বরং তাকে জানতে গেলে সত্য, যুক্তি, গভীর অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ঠিক এমনটাই সারাজীবন মনে করে এসেছেন অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়। ছোটো থেকেই দুটি বিষয়ে ছিল প্রবল আগ্রহ। ইতিহাস, ও সাহিত্য। টুকটাক লিখতেনও। কলেজে পড়ার সময় হঠাৎই তাঁর হাতে আসে মেকলে’র লেখা ‘ক্লাইভ অ্যান্ড হেস্টিংস’ বইটি। বিচক্ষণ অক্ষয় বুঝতে পারেন, বইতে যা লেখা আছে, তা সত্যি নয়। এরপরই ইতিহাস নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি। যা জারি ছিল শেষ দিনটি পর্যন্ত।

শুধু ইতিহাস গবেষণাই নয়, রীতিমতো মাঠে নেমে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, লোকসাহিত্য, তার ইতিহাস ইত্যাদি নিয়ে অনুসন্ধান করেন। নিজের একাধিক গ্রন্থে ছুঁয়ে গিয়েছেন সেইসব প্রসঙ্গও। মানবিক জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায়, বিশেষ করে ইতিহাস, সাহিত্য, ভাষা, সংস্কৃতি. চিত্রকলা এবং প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে তার উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। ধারণা করা হয় তার বিচক্ষণতায় প্রভাবিত হয়েই শরৎকুমার রায় বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটি এবং বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

Caption

সিরাজদ্দৌলা, ফিরিঙ্গি বণিক, রানী ভবানী ইত্যাদি বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে তিনি লিখে চলেন একের পর এক লেখা। ইতিহাস নিয়ে একটি পত্রিকাও বের করেন তিনি, নাম ‘ঐতিহাসিক চিত্র’। সেই থেকেই যাত্রা শুরু বাংলার প্রথম ত্রৈমাসিক পত্রিকার। ১৯১২ সালে বের করেন তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বই ‘গৌড়লেখমালা’। পাল বংশের বিভিন্ন শিলালিপি ও তাম্রলিপির পাঠোদ্ধার করে, তার বাংলা অনুবাদ করে এই বইটি প্রকাশ করেছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে গবেষকদের অন্যতম প্রয়োজনীয় বইয়ের তালিকায় এর নাম উঠে আসে।

এ তো গেল ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়’র কথা। আরও দুটি বিষয়ে তাঁর অবদানের কথা স্বীকার না করলে বোধহয় অন্যায় হবে। একটা সময় ইংরেজ আমলে সেনাবাহিনীতে কোনো বাঙালিকে নেওয়া হত না। যুক্তি হিসেবে বলা হত, বাঙালিরা নাকি অসামরিক; যুদ্ধ-বিগ্রহ এদের দ্বারা হবে না। এই ব্যাপারে নানা সময় নানা আন্দোলন উঠে আসে। বাঙালি ছেলেরা যাতে যোগ দেয়, তার জন্য ১৯১৬ সালে তৈরি করা হয় ‘বেঙ্গল রেজিমেন্ট কমিটি’। বাঙালি যুবাদের উদ্বুদ্ধ করা, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়াই এদের কাজ। সেই সময় এর সঙ্গে যুক্ত হন অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ও। রাজশাহীতে পল্টন গঠনের জন্য তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁর দত্তক ছেলেও এই বাহিনীতে যোগ দেন। অবশেষে, তাঁদের সম্মিলিত চেষ্টার ফলেই ব্রিটিশরা ‘বাঙালি পল্টন’ বা ‘ফর্টিনাইন্থ বেঙ্গলি রেজিমেন্ট’ বলে একটি আলাদা বাহিনী গঠন করেন।

এছাড়াও, বাংলায় রেশম স্কুল, রেশম চাষ সর্বোপরি রেশম শিল্পের উন্নতিসাধন ও প্রসারেও অবদান রাখেন অক্ষয়বাবু। ১৮৯৮ সালে রাজশাহীতে নিজে একটি রেশম স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। নিজেও ছিলেন সেখানকার শিক্ষক। তাঁর একান্ত প্রচেষ্টার জন্য পরে রাজশাহী থেকে রেশম ও গুটিপোকার বীজ ছড়িয়ে পড়তে থাকে ভারত ও ভারতের বাইরে।

ওকালতিকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই পরিচয়তেই সন্তুষ্ট থাকেননি তিনি। বাংলার আধুনিক ইতিহাসচর্চার অন্যতম প্রবর্তক অক্ষয়কুমার নিজের মতো করে চালিয়ে গেছেন কাজ। স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘আধুনিক বাংলার লেখকদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়’ হিসেবে মনে করতেন। কিন্তু আক্ষেপ, ইতিহাসে লেখা থাকলেও, সমাজ জীবনে তাঁর নাম প্রায় বিস্মৃতই থেকে গেল। তিনি যবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেই বছরেই (১৮৬১) জন্মেছিলেন আরও দুই কিংবদন্তি মানুষ; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তিনজনেই তিনটি ক্ষেত্রে অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় থেকে গেলেন আড়ালের মানুষটি হয়ে।

Link copied!