১৯২৮ সালে পরাধীন ভারতে ২১ বছর বয়েসী এক রোমানিয়ান শ্বেতাঙ্গ যুবক মির্চা এলিয়াদ ভারতীয় দর্শন সম্পর্কে গবেষণা করতে আসে কলকাতায়। পেয়িং গেস্ট হিসেবে তার থাকার জায়গা হয় তারই গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক তৎকালীন বাংলার অন্যতম শিক্ষাবিদ, গবেষক ও দার্শনিক, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের ভবানীপুরের বাড়িতে।
বাড়ির কর্তা সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের এক তরুণী কন্যা ছিলেন। সেই কন্যা ছিল ভীষণ সুন্দরী। তার ডাগর ডাগর কাজলচোখ, ছিপছিপে বাঙালি আদল, মাটির প্রতিমার মতো নিখুঁত তন্বী চেহারা মুগ্ধ করতো অনেককেই। বয়সের তুলনায় তার বুদ্ধি, স্বভাব, গাম্ভীর্য ও বিদ্যানুরাগ তাকে তার সমসাময়িক কিশোরীদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল। বাবার কাছে বাংলা, ইংরেজি, সাহিত্য, সংস্কৃতির শিক্ষা নিতে নিতে অচিরেই মৈত্রেয়ী সাহিত্যানুরাগী এক কিশোরীতে পরিণত হয়। কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যের শুরুতে তার জীবনে আবির্ভাব ঘটে তার গুরুদেবন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তারপর সেই তরুণী তার বাকি জীবনে যতো লেখালেখি করেছেন তাতে তার গুরুদেবের প্রভাব স্পষ্ট।
এতক্ষণ যার কথা বলছিলাম উপক্রমণিকায় তিনি আর কেউ নন সেই রোমানিয়ান যুবক মির্চা এলিয়াদ যে বাঙালি রমনীর প্রেমে পড়ে লিখেছিলেন ‘লা নুই বেঙ্গলী’ বা `Bengali Nights’ এর মতো অমর প্রেমগাঁথার নায়িকা বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি, ঔপন্যাসিক, দার্শনিক মৈত্রেয়ী দেবী।
১৯১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন মৈত্রেয়ী দেবী। তার বাবা সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের তৎকালীন কর্মস্থল ছিলো চট্টগ্রাম। মৈত্রেয়ীর শৈশবের বড় একটা অংশ কাটে বাবার বাড়ি বরিশাল জেলার আগৈলঝারার গৈলা গ্রামে। পরে বাবার কর্মস্থলের সুবাদে তাকে চলে যেতে হয় কলকাতায়। ১৯৩৬ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
এখানে পড়াকালীন মির্চা এলিয়াদের সাথে তার প্রণয়ের গোপন কথাটি তার পরিবার জেনে গেলে তারা মৈত্রেয়ী বিয়ে ঠিক করেন। ১৯৩৪ সালে মৈত্রেয়ী বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. মনোমোহন সেনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
১৯৩০ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়েসে মৈত্রেয়ীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উদিত’ প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থের ভূমিকা লিখেছিলেন তার গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। এরপর ১৯৪২ সালে রবীন্দ্রনাথের মংপুতে কাটানো দিনগুলোর স্মৃতি ও তার সাথে আলাপচারিতা নিয়ে লিখেন স্মৃতিকথা ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’। এটি ‘টেগোর বাই ফায়ারসাইড’ নামে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়। রবীন্দ্র বিষয়ক তার অন্যান্য রচনাগুলো হল, ‘স্বর্গের কাছাকাছি’, ‘কবি সার্বভৌম’, ‘রবীন্দ্রনাথ গৃহে ও বিশ্বে’, এবং ‘রবীন্দ্রনাথ: দি ম্যান বিহাইন্ড হিজ পোয়েট্রি’। তার আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘ন হন্যতে’। এই উপন্যাসটিই তাকে পাঠক মহলে খ্যাতির শীর্ষে তুলে নিয়ে যায়। অনেকে দাবী করেন মির্চা এলিয়াদের ‘লা নুই বেঙ্গলী’র জবাবে এঠি লিখেছিলেন মৈত্রেয়ী। ১৯৭৫ সালে ভারতীয় লেখিকা সংঘ ‘ন হন্যতে’ ('ন হন্যতে' মানে 'যাকে বিনাশ করা যায় না') উপন্যাসের জন্য তাকে সম্মানসূচক পদক দেয়। ‘ন হন্যতে’র ইংরেজি অনুবাদ It Does Not Die: A Romance। বইটিতে মৈত্রেয়ী তার দৃষ্টিভঙ্গি, জীবন বোধ, ইংরেজ শাসনামলে ভারতের সমাজ ব্যবস্থা এবং জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরেন। বইটির জন্য তিনি ১৯৭৬ সালে সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার লাভ করেন।
তার অন্যান্য সাহিত্যকর্মের মাঝে আছে, কাব্যগ্রন্থ: চিত্তছায়া। উপন্যাস: ন হন্যতে। গল্পগ্রন্থ: বিধি ও বিধাতা, এত রক্ত কেন, ঋগ্বেদের দেবতা ও মানুষ, হিরণ্ময় পাখি এবং আদিত্য মারীচ। এছাড়াও মৈত্রেয়ী দেবী লিখিত ভ্রমণকাহিনী হলো অচেনা চীন, মহাসোভিয়েত এবং চীনে ও জাপানে।
১৯৭৭ সালে মৈত্রেয়ী দেবীকে তার সাহিত্যকর্ম ও সমাজসেবার স্বীকৃতি স্বরূপ ‘পদ্মশ্রী’ পদক দেওয়া হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯০ সালে মৈত্রেয়ী দেবী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।