মহান বিপ্লবী, রাজনীতিবিদ, ভারত উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ কমরেড মুজাফফর আহমদ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার প্রথম শ্রোতা এই সামবাদীর আজ প্রয়ান দিবস।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মুজাফফর আহমদ ছিলেন সন্দ্বীপের সন্তান। ভারতের রাজনীতিতে কাকাবাবু নামে পরিচিত রাজনীতিবিদের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী পুরুষ নজরুল ইসলামের ছিল গভীর বন্ধুত্ব।
চট্রগ্রামের (সাবেক নোয়াখালী) সন্দিপ উপজেলায় জন্ম নেওয়া কমরেড মুজাফফর আহমদ আমৃত্যু জীবন কাটিয়েছেন নিখিল ভারতে-আন্দোলন সংগ্রামের প্রয়োজনে।

(বামদিক থেকে) মুজাফফর আহমদ. বঙ্কিম মুখার্জী, পি সি যোশি, সোমনাথ লাহিড়ী-১৯৩৭ সালে কলকাতায়।ছবি-সংগৃহীত
ভারত স্বাধীনতা লাভের পর স্থায়ী কলকাতায়। ১৯৭৩ সালের এই দিনে প্রয়াণও হয় কলকাতায়। পশ্চিম বঙ্গ সহ ভারতে যে ক'টি রাজ্যে বাম ফ্রন্ট বিভিন্ন মেয়াদে ক্ষমতায় ছিলো তা কিন্তু কমরেড মুজফফর আহমদ এর রাজনৈতিক অবদান।
‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ সম্পাদনা করতেন মুজাফফর আহমেদ। এই পত্রিকায় কাজ করতে গিয়ে নজরুল ও মুজাফফর আহমেদের প্রথম পরিচয় ঘটে। ১৯১৮ সালে ‘বঙ্গীয় মুসলামান সাহিত্য পত্রিকা’য় প্রকাশের জন্য প্রথম লিখা পাঠান কাজী নজরুল ইসলাম। এর পর থেকে দুজনের মধ্যে পত্র লেখালেখি শুরু হয়।
মুজাফফর আহমেদ ও কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিলো ১৯২০ সালে। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘নবযুগ’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন যৌথভাবে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও রাজনীতিবিদ কমরেড মুজফ্ফর আহমদের। এটি ১৯২০ সালের ১২ জুলাই সান্ধ্য পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হওয়া শুরু করে। এসমইয় মুজাফফর আহমদ দ্বারা দারুন ভাবে প্রভাবিত হন কবি কাজী নজরুল ইসলাম । মুজাফফর আহমদের সংস্পর্ষে থেকে নজরুল শ্রমজীবি মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনিই মূলত নজরুলকে সাম্যবাদী ও বিপ্লবী রচনা কবিতা লিখতে অনুপ্রানিত করেন।

আবদুল হালিম, সরোজ মুখোপাধ্যায়, মুজাফফর বেঙ্গল প্রাদেশিক সম্মেলনে (১৯৩৮ ডিসেম্বর - ১৯৩৯ জানুয়ারী) চন্দননগরে। ছবি: সংগৃহীত
এর পর নজরুল সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ ও ‘লাঙল’ পত্রিকায় একসাথে কাজ করেন মুজাফফর আহমদ। মুজাফফর আহমদ ও নজরুল ইসলাম কলকাতা ৩/৪ সি তালতলা লেন এর একটি বাড়ির নিচ তলায় একই রুমে ভাড়া থাকতেন। সে বাড়িতেই নজরুল তাঁর কালজয়ী ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি লিখেছিলেন।নজরুলের কালজয়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’র প্রথম শ্রোতা ছিলেন কমরেড মুজাফফর আহমদ।
এসম্পর্কে কমরেড মুজাফফর আহমদ তাঁর ব্যাক্তিগত স্মৃতী কথায় লিখেছেন, ‘আসলে বিদ্রোহী কবিতা রচিত হয়েছিল ১৯২১ সালের ডিসেম্বার মাসের শেষ সাপ্তাহে। সে কবিতাটি লিখেছিল রাত্রিতে। রাত্রির কোন প্রহরে তা আমি জানিনে। ওদিন রাত ১০ টার পর আমি ঘুমিয়ে পরেছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে আমি বসেছি এমন সময় নজরুল বললো সে একটি কবিতা লিখেছে। পুরো কবিতাটি সে আমায় পড়ে শুনালো।বিদ্রোহী কবিতার আমিই প্রথম শ্রোতা।’

কাজী নজরুল ইসলামের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে কমরেড মুজাফফর আহমদ। ছবি-সংগৃহীত
পশ্চিম বঙ্গে কমরেড জ্যোতি বসু,কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কমরেড মুজফফর আহমদেরই সৃষ্টি। বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ভুপেন হাজারিকে আমরা ভালোবাসি তিনিও মুজফফর আহমদ এর সংস্পর্শ ছাড়া হতো না ।যদিওবা ভুপেন হাজারিকা জীবনের শেষ সায়াহ্নে এসে বিজেপিতে যোগদান করেন।
কমরেড মুজফফর আহমদ এর সংস্পর্শ পেয়েছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভারত স্বাধীনতা লাভের পরও কংগ্রেস ও বামদের যে সমন্বয় হয়েছিল অনেক বাম নেতা কিন্তু জওহর লাল নেহেরুর সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করেছেন বা ভাগ নিয়েছেন। কমরেড মুজফফর আহমদ তা কোনটাই করেননি। তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে তোলেছেন।
৬০ দশকে কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভক্তিতে জড়াননি।তিনি খুব দ্রুত বিপ্লবও চেয়েছেন বলে কোথাও পড়িনি। মাও চিন্তা ধারা বা মাওবাদীদের গঞ্জনাও খুব সহজ ভাবে হজম করেছেন। আবার সোভিয়েত রাশিয়ার কথায় অন্ধভাবে কলকাতায় বিনা বৃষ্টিতে ছাতা ধরেননি কলকাতা শহরে।
কমরেড মুজফফর আহমদ নিজেই সিপিআই (এম) গড়েছেন। সিপিআই (এম) কে নিয়ে অপরাপর অনেক বামপন্থী রাজনৈতিক দল নিয়ে ইস্যু ও নির্বাচনকেন্দ্রিক জোট গঠন করেন। সেই জোটের নাম বামফ্রন্ট। তার ফলাফল ভারতের পশ্চিম বঙ্গ সহ বেশ ক'টি রাজ্যে বাম ফ্রন্ট দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতায় ছিল।
কমরেড মোজাফফর আহমদ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন করেছিলেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অসুস্থ অবস্থায় বিবৃতি দিয়ে বামফ্রন্টের সকল কমরেডসদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন, লাখো শরনার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। কলকাতার মাঠে ময়দানে গণসঙ্গীত শিল্পী ও দল গুলো কেও শরনার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর গণগীতি রচনা করে গানের আয়োজন করে চাঁদা তুলতেন শরনার্থী শিবিরের জন্য।
কমরেড মোজাফফর আহমদ সোভিয়েত ইউনিয়ন এর প্রতিষ্ঠাতা কমরেড ভ্লাদিমির ইলিস লেনিন ও কমরেড জোসেফ স্টালিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। পশ্চিম বঙ্গের বামফ্রন্ট যখন ধীরে ধীরে কমরেড মোজাফফর আহমদ এর নীতি ও আদর্শ বিচ্যুত হতে লাগলো একপর্যায়ে তার স্থান দখল করে নিলো তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি। এমনটাই মনে করেন বিশ্লেষকেরা।