‘তুমি আর আমি কাহিনী হবো বাংলার ঘরে ঘরে’, জহির রায়হানের উপন্যাস ‘হাজার বছর ধরে ‘ উপজীব্য করে নির্মিত চলচ্চিত্রের একটি গান। বাংলা সাহিত্য ও চলচচ্চিত্রের কিংবদন্তী জহির রায়হান হারিয়ে গেছেন ৫১ বছর হলো। হারিয়ে গিয়ে উক্ত গানের কথার মতো কাহিনী হয়েছেন বাংলার ঘরে ঘরে। কাহিনী হওয়া একজন জহির রায়হানের জন্য অপেক্ষা আমাদের হাজার বছরের। আজ তার জন্মদিন।

জহির রায়হান নামের সঙ্গে আমাদের অধিকাংশের পরিচয় নবম-দশম শ্রেণীর বাংলা সহপাঠের ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাস দিয়ে। তারপর ক্রমে আমরা দেখতে পাই আরেক ফাল্গুন, বরফ গলা নদী, শেষ বিকেলের মেয়ে ইত্যাদি উপন্যাসগুলোর কলেবরজুড়ে জহির রায়হানের কলমের ধার। মাত্র ৩৭ বছর বেচে থাকা এই কীর্তিমান মহাপুরুষকে ক্ষণজন্মা বলা যায় নির্দ্বিধায়।
জহির রায়হান ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনী জেলার সোনাগাজি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নেনর মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি পরিবারের সাথে কলকাতা থেকে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) স্থানান্তরিত হন।

১৯৫৮ সালে জহির রায়হান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫০ সালে তিনি ‘যুগের আলো’ পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে জহির রায়হানের সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে প্রবাহ পত্রিকায় যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ সূর্যগ্রহণ প্রকাশিত হয়।
১৯৫৭ সালে জাগো হুয়া সাভেরা ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন।১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র সঙ্গম নির্মাণ করেন (উর্দু ভাষার ছবি) এবং পরের বছর তার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র বাহানা মুক্তি দেন।
বাংলা চলচ্চিত্রে জহির রায়হান রেখেছেন অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম রঙির চলচ্চিত্র সংগমের নির্মাতাও আমাদের জহির রায়হান। পেয়েছেন একাধিক চলচ্চিত্র পুরস্কার। ‘স্টপ জেনোসাইড‘, ‘লেট দেয়ার বি লাইটে‘র মতো বিশ্বখ্যাত প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সাড়া ফেলেছিলেন। আন্তর্জাতিক বোদ্ধাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিলেন বাংলাদেশে চলমান পাকিস্তানি গণহত্যা নিয়ে।

জহির রায়হান ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ২১শে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে তার সরব উপস্থিতি ছিল। ভাষা আন্দোলন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেয়া’তে।তিনি ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন।

মাত্র ৩৭ বছরের জীবনে জহির রায়হান বাংলা কথা সাহিত্য এবং চলচ্চিত্রে যে অবদান রেখেছিলেন তার কোন তুলনা হয় না। কোন পুরস্কারই যেন তার অবদানকে মূল্যায়ন করতে যথেষ্ঠ নয়। তবুও স্বাধীন বাংলাদেশে তার অসামান্য অবদানের জন্য তাকে ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে, ১৯৭৭ সালে মরনোত্তর একুশে পদক এবং ১৯৯২ সালে তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
জহির রায়হান নিখোঁজ হন ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি। ১৯৭১ সালে শহীদ হওয়া বুদ্ধিজীবীদের তালিকায় যুক্ত হয় তার নাম, তাও আবার স্বাধীন দেশেই। স্বাধীনতার অর্ধশতক বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলা কথাসাহিত্য এবং চলচ্চিত্রে এক জহির রায়হানের অভাব যেন অপূরণীয়। একজন জহির রায়হানের জন্য বাঙালির অপেক্ষা যেন হাজার বছরের।