হলিউডের পরই বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সিনে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে ধরা হয় বলিউডকে। আর বলিউডে খানদের ছড়াছড়ি নতুন নয়। বলিউড জগতে খানদের রাজত্ব বলতে শাহরুখ, আমির ও সালমানদের আধিপত্যই বোঝায়। বলিউডের এই তিন খান গত তিন দশক ধরে আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তায় রাজত্ব করেছেন। তবে একটা সময় সব রাজত্বেরই অবসান হয়, হয়েছেও তাই। বর্তমানে এই তিন খানের প্রভাব ছাড়িয়েও যিনি প্রথম সারির জনপ্রিয় তারকাদের একজন হয়েছেন, তিনি অক্ষয় কুমার। বলিউডে খানদের রাজত্বে ভাগ বসানো খিলাড়ি।

বলিউডের ‘খিলাড়ি’ হিসেবেই বেশি পরিচিত অক্ষয় কুমার। বলিউডে খানদের রাজত্বে অন্য অনেকের অবস্থা যখন নাজেহাল, তখন অপ্রতিদ্বন্ধী ও প্রযোজক-পরিচালকদের নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছেন অক্ষয়। তার ছবি মানেই প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের হামলে পড়া। কমেডি-অ্যাকশান ধাঁচের এই নায়কের বেশ কয়েকটি ছবি ছুঁয়েছে শত কোটির ক্লাব।

আজ ৯ সেপ্টেম্বর অক্ষয় কুমারের জন্মদিন। ১৯৬৭ সালের এই দিনে ভারতের পাঞ্জাবে জন্মগ্রহণ করেন। মার্শাল আর্টের প্রতি আগ্রহ থাকায় তা শিখতে ব্যাংকক যান। থাইল্যান্ডের যুদ্ধ বিষয়ক খেলা ‘মুই থাই’ শেখার পর দেশটির একটি হোটেলে প্রধান ওয়েটারের কাজ করেন অক্ষয়।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার হোটেল পূর্বাণীতেও কিছুদিন শেফ (রাধুঁনী) হিসেবে কাজ করেছেন অক্ষয়। কলকাতার একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করার পর ফির যান মুম্বাই। মার্শাল আর্ট শেখোনো শুরু করেন কারাতে ‘ব্লাক বেল্ট’ পাওয়া এই অভিনেতা। ওখানে শিক্ষক অক্ষয়কে এক ফটোগ্রাফার ছাত্র মডেলিং করার জন্য পরামর্শ দেয় । আর এভাবেই চলচ্চিত্রে প্রবেশের পথ পেয়ে যান।

১৯৯১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সৌগন্ধ’ ছবির মধ্য দিয়ে অক্ষয় কুমার চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন। তিন বছর পর রাজিব রাই পরিচালিত মোহরা চলচ্চিত্রে ও সমীর মালকান পরিচালিত ম্যাঁয় খিলাড়ি তু আনাড়ি ছবিতে তার অভিনয় ব্যাপক প্রশংসিত হয়। একই বছরে মুক্তি পায় যশ চোপড়া পরিচালিত ইয়ে দিল্লাগী ছবিটি। অক্ষয় কুমার অভিনীত এই তিনটি চলচ্চিত্র সুপার ডুপার হিট করলে চলচ্চিত্রে তার আসন অনেকটা পাকাপোক্ত হয়ে যায়।
ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছিলেন ‘অসম্ভব একটি শব্দ যেটি বোকাদের অভিধানেই পাওয়া যায়।’ এটা ভাল করেই জানতেন তিন হাজার কোটির ক্লাবে প্রবেশ করা প্রথম বলিউড অভিনেতা। তাইতো অক্লান্ত পরিশ্রম আর অধ্যাবসায়ের মাধ্যমেই তিনি আজ এই স্থানে পৌঁছতে পেরেছেন।

সালমান ও আমির খানের পরিবার বলিউড চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেক আগে থেকেই। সালমানের বাবা সেলিম খান বলিউড অভিনেতা ও প্রখ্যাত চিত্রনাট্যকর। আমির খানের বাবা তাহির খান ছিলেন বলিউড চলচ্চিত্রের অভিনেতা, প্রযোজক, পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার। চলচ্চিত্রে আমির-সালমানের প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পেছনে পারিবারিক ইমেজ একটু হলেও কাজ করেছে। তবে শাহরুখ খান ও অক্ষয়ের বেলায় তা ঘটেনি।
সাম্প্রতিক বছরে বলিউড চলচ্চিত্রগুলোর বাণিজ্যিক দিক আলোচনা করলে দেখা যায় তিন খানের ছবিগুলো বক্সঅফিস তেমন কাঁপাতে পারেনি। তাদের ছবিগুলো ‘ফ্লপ’ না করলেও দর্শকের মন বরাতে পারেনি। লাভের মুখ দেখেছে খুবই সামান্য।

সম্প্রতি ‘জিরো’ ছবিতে নিজের ব্যর্থতার ক্ষত মেরামতে শাহরুখ ব্যস্ত ছিলেন। নিজের প্রোডাকশন হাউস থেকে ‘দিলওয়ালে’ উপহার দিয়েও দর্শকদের খুশি করাতে পারেননি বলিউড বাদশা। অন্যদিকে, আমির শুধু লাল সিং নয়, তাঁর বিগ অ্যারেঞ্জমেন্টের ছবি ‘ঠাগস অব হিন্দুস্থান’ও কাঁপাতে পারেনি বলিউড বক্স অফিস।

আর মাসলম্যান সালমান ব্যস্ত ছিলেন তাঁর পেশি আর ইমেজ নিয়ে ‘রাধে : ইউর মোস্ট ওয়ান্টেড’-এর কাজে। ভাইজানখ্যাত সালমানের ‘রাধে’ মুক্তি পেলেও ছবিটি সমালোচক-দর্শকদের টানতে পারেনি। বাণিজ্যিকভাবেও ছবিটি বড় কোনো সাফল্য পায়নি।

এদিক দিয়ে ২০১৯ সালের শেষের দিকে মুক্তি পাওয়া অক্ষয় কুমারের মিশন মঙ্গল, হাউসফুল ফোর ও গুড নিউজ ভাল ব্যবসা করে। অক্ষয় কুমার ও কারিনা কাপুর অভিনীত ও রাজ মেহতা পরিচালিত ‘গুড নিউজ’ ছবিটি সুপার ডুপার হিট করে।
বিজ্ঞাপন থেকেও আয়ের ব্যাপারে বলিউডের সবাইকে পেছনে ফেলে দিয়েছেন অক্ষয় কুমার। ২০১৮ সালে শাহরুখ-আমিরও সালমানদের রাজত্ব খানখান করে শীর্ষে থাকেন মার্শাল আর্টের সাবেক এই শিক্ষক। ওই বছর ‘প্যাডম্যান’, ‘গোল্ড’ ও ‘২.০’ দেখা যায় অক্ষয়কে। শুধু একটিমাত্র ব্র্যান্ডে মুখ দেখাতে তিনি নিয়েছিলেন প্রায় ১০০ কোটি রুপি।

গত এক দশকে বলিউডের সবচেয়ে সফল অভিনেতা বলা যায় অক্ষয় কুমারকে। তার অভিনীত প্রায় সব সিনেমাই সফল। এর সুবাদে সবচেয়ে বেশি সিনেমা তার হাতেই রয়েছে। বছরব্যাপী তার সিনেমাই বেশি মুক্তি পায়। বর্তমানে তার হাতে রয়েছে ৮টি নির্মাণাধীন এবং মুক্তি প্রতীক্ষিত সিনেমা। এগুলো হচ্ছে- ‘সুর্যবংশী’, ‘লক্ষ্মী বোম্ব’, ‘বেল বটম’, ‘আতরাঙ্গি রে’, ‘পৃথ্বীরাজ’, ‘বচ্চন পান্ডে’, ‘রক্ষাবন্ধন’ এবং নাম ঠিক না হওয়া একতা কাপুরের একটি সিনেমা। গত ২৯ বছরে শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি।

বলিউডের এই খিলাড়ি অভিনেতা বিয়ের আগে বাস্তব জীবনেও ছিলেন খিলাড়ি। তার প্রেমিকাদের তালিকাটি বেশ দীর্ঘ। অভিনেত্রী ও মডেল পূজা বাত্রাকে দিয়েই তার প্রেমের ইনংস শুরু। তারপরে আসেন আয়েশা জুলকা।

‘খিলাড়ি’ ছবিতে অভিনয়ের সূত্রে পরিচয় ও প্রেম। ওই ছবির মাধ্যমে দুজনই তারকা খ্যাতি পেয়ে যান। এ ছবির সুবাদেই দুজনের প্রণয় ঘটে। খুব শিগগিরই তাদের সম্পর্কে বলিউডের টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়। পরে আসেন অভিনেত্রী রাভিনা ট্যান্ডন।রাভিনা নব্বুইয়ের দশকের সেক্স বম্ব হিসেবে আলোচিত ছিলেন। তাদের ‘টিপ টিপ বরসা পানি’ গানটি পর্দায় ঝড় তোলে। একসময় আংটি বদল হলেও বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়নি।

বলিউডের অন্যতম আলোচিত এবং পিলে চমকানো গসিপ হিসেবে পরিচিতি পায় অক্ষয়ের সঙ্গে রেখার সম্পর্কের কাহিনী। ‘খিলাড়িও কি খিলাড়ি’ সিনেমার শুটিং চলাকালেই ১২ বছরের বেশি বয়সী অভিনেত্রী রেখার সঙ্গে তার প্রেমের গল্প বাষ্প তোলে।
আইকনিক বিউটি শিল্পা শেঠির সঙ্গে বেশ হট ক্যামিস্ট্রি গড়ে তোলেন অক্ষয়। এক বছর তাদের সম্পর্ক মিডিয়ায় বেশ আলোচিত ছিল। কিন্তু শিল্পার কাছের বন্ধু টুইঙ্কেল খান্নার সঙ্গে মিস্টার খিঁলাড়ির দহরম-মহরম দেখার পর শিল্পা মুখ ফিরিয়ে নেন।

ব্যক্তিগত জীবনে অক্ষয় কুমার বিয়ে করেছেন প্রয়াত অভিনেতা রাজেশ খান্নার মেয়ে অভিনেত্রী টুইঙ্কেল খান্নাকে। অক্ষয়ের শাশুড়ি ডিম্পল কাপাডিয়াও বলিউডের এক সময়ের জনপ্রিয় নায়িকা। অক্ষয়-টুইঙ্কেলের এক পুত্র ও এক কন্যা রয়েছে। তবে তাদেরকে মিডিয়া থেকে দূরে রাখেন অক্ষয়-টুইঙ্কেল। একটি স্বাভাবিক শৈশব-কৈশোর যেন তারা পায়, সেজন্যই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এই দম্পতি।

অভিনয়ের মাধ্যমে অক্ষয় কুমার জীবনে সব কিছুই পেয়েছেন। অঢেল অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি কোটি কোটি দর্শকের ভালোবাসা। আর পুরস্কার-সম্মাননা তো আছেই। ২০০৯ সালে তাকে ভারত সরকার ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করে। সেরা অভিনেতা হিসেবে ‘রুস্তম’ সিনেমার জন্য পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এছাড়া ‘প্যাডম্যান’ সিনেমার জন্য পেয়েছেন সম্মানজনক আরো একটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এছাড়া দুইবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, একবার স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড, তিনবার আইফা অ্যাওয়ার্ড, নয়বার স্টারডাস্ট অ্যাওয়ার্ডসহ বহু পুরস্কার লাভ করেছেন।