বাংলাদেশি ওটিটি প্লাটফর্ম চরকি'র যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে রবিউল আলম রবি পরিচালিত অ্যানথোলজি সিরিজ/ ওয়েব ফিল্ম 'ঊনলৌকিক' দিয়ে। চরকি ইতোমধ্যেই এর অফিশিয়াল পোস্টার রিলিজ করেছে এবং ফিল্মটি ঈদ-উল-আযহায় চরকি তে মুক্তি পাবে।
'ইতি, তোমারি ঢাকা' রিলিজের পর নির্মাতারা দাবী করেছিলেন বাংলাদেশের প্রথম অমনিবাস/অ্যানথোলজি চলচ্চিত্র এটি। এই অমনিবাস/অ্যানথোলজি চলচ্চিত্রের চর্চা ফিল্মের দুনিয়ায় বেশ আগে থেকেই হয়ে আসছে, খুঁজে পেতে দেখলে সকল সিনেমাপ্রেমিই আবিষ্কার করবেন যে, জেনে বা না জেনে অনেক অ্যানথোলজি ফিল্মই সবারই কম বেশি দেখা আছে। অ্যানথোলজি হচ্ছে কয়েকটি ক্ষুদ্র চলচ্চিত্রের (যেমন শর্ট ফিল্ম) সমষ্টি যেগুলো আলাদা আলাদা ভাবে প্রত্যেকেই স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ তবে... এদের মধ্যে একটি সাধারণ ব্যাপার/ কমন ফ্যাক্টর থাকবে।এই স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ চলচ্চিত্রগুলো যখন একসাথে দেখা হবে, সেটির সম্মিলিত আলাদা একটা প্রভাব অনুভূত হবে। যেমন আয়নাবাজী সিরিজের কথা ধরলে দেখা যাবে যে, মূল চলচ্চিত্র আয়নাবাজীর আইডেন্টিটি পলেটিক্স হচ্ছে সবগুলো এপিসোডের কমন ধারা- এপিসোডগুলো স্বাধীন, মূল চলচ্চিত্র আয়নাবাজী থেকে একেবারে আলাদা কিন্ত পরস্পরের সাথে এরা একটি কমন থিমের মাধ্যমে কানেক্টেড। ঊনলৌকিক এর পোস্টার বের হয়েছে, মূল কন্টেন্ট রিলিজের আগে আমরা অ্যানথোলজি ফিল্ম নিয়ে একটু আলাপ করে নেই- কে কিভাবে এর আগে অ্যানথোলজি নির্মাণ করেছেন আর আলাদা করে অ্যানথোলজি ফিল্ম নির্মানের কারণটাই বা কি।
আমার দেখা ও অভিজ্ঞতার আলোকে অ্যানথোলজি ফিল্ম কে তিনভাগে আমরা ভাগ করতে পারিঃ
১) কমন থিম/ ভাব
২) কমন সেটিং/ আবহ
৩) কমন ঘটনা সুত্র
কমন থিম/ ভাব নিয়ে নির্মিত এন্থোলজিঃ
কমন থিম/ ভাব নিয়ে কিছু দুনিয়া কাঁপানো অ্যানথোলজি ফিল্ম কোনগুলো?
i) দ্যা ব্যালাড অফ বাসটার স্ক্রাগস: কোয়েন ভাইরা ওয়েস্টার্ন ঘরানা কে কেন্দ্র করে ৬ টি গল্পে নির্মান করেছেন এই অ্যানথোলজি ফিল্ম। প্রত্যকেটি গল্প একটি আরেকটি থেকে আলাদা, বিচিত্র, ভিন্ন তবে এদের সবার কমন থিম হচ্ছে ওয়েস্টার্ন দুনিয়ার জীবন-ধারা।
ii) এরোস: প্রেম-কামনা ও যৌনতা নিয়ে নির্মিত এই অ্যানথোলজি ফিল্মের নির্মাতাগণের নামই যথেষ্টঃ ওং-কার ওয়াই, সোডেরবার্গ আর মাইকেল এঞ্জেলো আন্তোনি।
iii) লাভ, ডেথ এন্ড রোবটস: সাই-ফাই, থ্রিলার, হরর ঘরানার ১৮টি দুর্দান্ত শর্ট ফিল্ম নিয়ে নির্মিত টিম মিলার ও ডেভিড ফিঞ্চারের অমনিবাস। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই দুজন ১৯৮১ সালের ‘হেভি মেটাল' নামক অমনিবাস কে রিবুট করে এই অমনিবাস চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। এই 'হেভি মেটাল' এর বিষয় বস্তুও লাভ,ডেথ ও রোবটসের মতো বিচিত্র, শ্বাসরুদ্ধকর ও চ্যালেঞ্জিং! পরবর্তীতে এর একটি সিকুয়েল ও মুক্তি পায় 'হেভি মেটাল ২০০০' শিরোনামে। তবে, দুটোই প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য নির্মিত, ১৮ এর নিচে কোনোক্রমেই কোনো দর্শকের জন্য উপযোগী নয়।
iv) কয়াইদান: মাসাকি কোবাইয়াশি নির্মিত জাপানী লোকসাহিত্যের উপর হরর/সুপার ন্যাচারাল অমনিবাস চলচ্চিত্র। কান চলচ্চিত্র উৎসবে জুরি পুরষ্কার ও একাডেমী পুরষ্কার আসরে শ্রেষ্ঠ বিদেশী চলচ্চিত্র নমিনেটেড এই অমনিবাস ভৌতিক, দার্শনিক ।
একটি কমন সেটিং/ একই আবহ বা এলাকা নিয়ে এর অ্যানথোলজিঃ
১) নিউ ইয়র্ক স্টোরিজ: ৩টা শর্ট, নির্মাতা মার্টিন স্করসেসি, ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা, উডি এলান
২) প্যারিস যে'তাইম: ১৮টা শর্ট, নানান দেশের ২২জন নির্মাতা ( আলফন্সো কুয়ারন, কোয়েন ব্রাদার্স, টম টাইকার, নবুহিরো, ওয়াল্টার স্যালিস, গাস ভন সান্ত প্রমুখ।
৩) টোকিও! : ৩টা শর্ট, ৩ জন নির্মাতা( বং জুন হো, লিওস কারাক্স ও মিশেল গন্ড্রী)
একটি 'বস্ত' নিয়েও হতে পারে অ্যানথোলজি ফিল্ম।
যেমনঃ
১) জিম জারমুশের 'কফি এন্ড সিগারেটস' যেখানে ১১টি শর্ট ফিল্মে চরিত্ররা এই দুটি বস্ত সহযোগে নানান বিষয়ে আলোকপাত করে।
২) একটি ২০ ডলার নোটের নানান মানুষের হাতে বিচিত্র বিনিময়ের ঘটনা নিয়ে এগিয়েছে অ্যানথোলজি ফিল্ম 'টুয়েন্টি বাকস' এর ঘটনা!
সবসময় যে একটি মাত্র কমন ফ্যাক্টর থাকবে অ্যানথোলজি ফিল্মে, এমনও নয়। মাঝে মাঝেই কমন থিম, সেটিং ও ঘটনাসুত্র- এই তিনটি ফ্যাক্টর একে অপরকে স্পর্শ করবে, নানান ভঙ্গিমায় মিশ্রিত করে নতুন নতুন প্রকাশভঙ্গি নিয়ে হাজির হবে।
এছাড়াও দেখতে পারেন কিছু মনোমুগ্ধকর অ্যানথোলজি সিনেমা যা দর্শক হিসেবে আপনাকে অন্যরকম উচ্চতায় নিয়ে যাবেঃ
১) নাইট অন আর্থ/ জিম জারমুশ (২০০৪)
২) ওয়াইল্ড টেলস/ ড্যামিয়েন সিফ্রন ( ২০১৪)
৩) থ্রি...এক্সট্রিম/(২০০৫)
৪) অল দ্যা ইনভিসিবল চিলড্রেন/(২০০৫): রিডলি স্কট, স্পাইক লি প্রমুখ
৫) সেভেন ডেইজ ইন হাভানা (২০১২): গ্যাস্পার নোয়া, বেনিসিও ডেল তোরো প্রমুখ
৬) 'নিউ ইয়র্ক, আই লাভ ইউ' (২০০৮) : নাটালি পোর্টম্যান, মিরা নায়ার প্রমুখ
সাধারণত অ্যানথোলজি ফিল্মে একাধিক নির্মাতা থাকে ( নির্মাতা ২ জন থেকে ২২ জন বা তারও বেশি হতে পারে তবে ব্যতিক্রম দূর্লভ নয় যেমন জিম জারমুশের নির্মিত ' নাইট অন আর্থ'/২০০৪ অথবা ড্যামিয়েন সিফ্রনের 'ওয়াইল্ড টেইলস' /২০১৪ অথবা ডেভিড ওয়েনের 'দ্য টেন'/২০০৭- সবগুলোর নির্মাতা এক জন। আবার 'প্যারিস, আইলাভ ইউ' এর নির্মাতা ২২ জন, নিউইয়র্ক স্টোরিজের নির্মাতা তিনজন। ঊনলোকিক সেদিক থেকে এক নির্মাতার ট্রেন্ড ফলো করেছে।
অ্যানথোলজির ফিল্মগুলোর মধ্যে কমন ফ্যাক্টরটি হতে পারে একটি বস্ত, একটি অঞ্চল অথবা একটি থিম যা নির্মাতা দর্শকদের বলার চেষ্টা করেন। “ব্যাপারটি টের পেয়েছেন তো?”- এরকম একটি প্রশ্ন প্রচ্ছন্ন ভাবে জিজ্ঞেস করা হয়। এই কমন বিষয়টি-ই মূলত অ্যানথোলজি কে সংজ্ঞায়িত করে। 'ইতি, তোমারি ঢাকা'-তে ঢাকার বিপুল রহস্য কে পরিভ্রমণ করার একটা চেষ্টা ছিলো- চরিত্র, লোকেশন, জীবনাচারণ- সবকিছুতেই ব্যাপারটা প্রকট। আর শিরোনামই তো বলে দেয় যে 'ইতি, তোমারি ঢাকা' ছিলো মার্টিন স্করসেসি, ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা, উডি এলান এর 'নিউ ইয়র্ক স্টোরিজ' কিংবা ২২ জন নির্মাতার 'প্যারিস, আইলাভইউর' মতো ঢাকার প্রতি তাদের সিনেমাটিক ট্রিবিউট। এই কমন বিষয়টি নির্ধারন করে অ্যানথোলজি ফিল্মের গতি, প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ও আচরণ।
রবিউল আলম রবির ঊনলৌকিক নির্মিত হয়েছে শিবব্রত বর্মনের লেখা ৫টি গল্প নিয়ে। পোস্টার মারফত এদের শিরোনাম জানা যায়ঃ
১- মরিবার হলো তার স্বাদ
২- দ্বিখন্ডিত
৩- ডোন্ট রাইট মি
৪- হ্যালো লেডিজ
৫- মিসেস প্রহেলিকা
ঊনলৌকিক এর আগে রবিউল আলম রবির কাজ দেখেছি- স্মৃতি ঝালাই করতে অন্তর্জালের শরণাপন্ন হয়ে দেখলাম সর্বশেষ এন্থলজি ফিল্ম 'ইতি, তোমারই ঢাকা'(২০১৮)-র 'মাগফিরাত', প্রজন্ম টকিজের (২০১৭)এর 'একই পথে' আর 'একুরিয়াম' এবং আয়নাবাজি অরিজিনাল সিরিজের(২০১৭) 'মুখোমুখি'। তবে দেখা হয়নি হইচই এর জন্য নির্মিত ফিল্ম 'শ্রীমতি ভয়ংকরী' (২০১৮)। মাগফিরাত, একই পথে, একুরিয়াম আর মুখোমুখি এমনকি শ্রীমতি ভয়ংকরী কে বিবেচনা করলে রবিউল আলম রবির প্রটাগনিস্ট অর্থাৎ প্রধান চরিত্রগুলো বাস্তবের ভেতরের বক্র বাস্তবে সমসময় বন্দি থাকার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ঊনলৌকিক এর এপিসোডগুলোর নাম থেকে ধারনা করা যায়, অরিজিনাল রবিউল আলম রবি তার নিজস্ব স্টাইলকে সম্ভবত আরো বিচিত্র ভাবে বিচরণ করেছেন কারণ এর আগে অ্যানথোলজির অংশ হলেও এবার তিনিই অ্যানথোলজি। টারান্টিনো স্করসেসি, কপোলা থেকে বং জুন, কার ওয়াই,সোডেরবার্গ, কোয়েন ব্রাদার্স-সবার ঝুলিতেই ক্যারিয়ারের প্রথম, মাঝ এমনকি পরিণত অবস্থাতেও অ্যানথোলজি নির্মাণের ঝোক লক্ষ্য করা যায়। সেই হিসাবে, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, রবিউল আলম রবির এই অ্যানথোলজি নির্মাণের প্র্যাকটিস দেশের চলচ্চিত্র ভাবনার বৈচিত্র্যকেই নির্দেশ করে। শিরোনামের বিবেচনা করলে, অলৌকিক আর লৌকিকের মাঝামাঝি কোনো অবস্থা নাকি এদুটি পেড়িয়ে ভিন্নকোনো অবস্থা তুলে ধরেছেন রবিউল আলম রবি- সেটি রিলিজের পর বোঝা যাবে।