রওশন জামিল: ট্যাবু ভাঙার কিংবদন্তি এক অভিনেত্রী

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

মে ১৪, ২০২২, ০৭:১১ পিএম

রওশন জামিল: ট্যাবু ভাঙার কিংবদন্তি এক অভিনেত্রী

দেখতে দেখতে ১৮ বছর  হয়ে গেল কিংবদন্তি অভিনেত্রীর রওশন জামিলের চলে যাওয়ার। ২০০২ সালের ১৪ মে প্রয়াত হন তিনি। শুধু ‘কিংবদন্তি’ শব্দবন্ধটি দিয়েও হয়তো একজন রওশন জামিলের অবদান বুঝানো যাবে না। তিনি ছিলেন চলচ্চিত্রে নারীদের অভিনয়ে ট্যাবু ভাঙার প্রথম হুইশেল ব্লোয়ার। যখন সমাজে নারীদের সিনেমা-নাটকে অভিনয় ছিল কল্পনাতীত, সেই সময়েই তিনি অন্য নারীদের উৎসাহী করা ত বটেই, নিজেও নেমে পড়েন রূপালি পর্দায় অভিনয় করতে। এরপর একে একে উপহার দিয়েছেন অগণন সিনেমা।

রওশন জামিল কত বড় মাপের অভিনেত্রী ছিলেন তা এই প্রজন্মের অনেকেই হয়তো অনুধাবন করতে পারবেন না। তাঁকে জানতে হলে ফিরে যেতে হবে ৫০-এর দশকে। তখন ছেলেরাই মেয়ে সেজে অভিনয় করতো। সেটাই ভেঙে দেন রওশন জামিল। তখন জগন্নাথ কলেজে (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) শরৎচন্দ্রের দেবদাসে তিনি অভিনয় করেন।

বরেণ্য অভিনেত্রী রওশন জামিলের জন্মদিন আজ

খল অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে স্বাতন্ত্র্য  করেছিলেন, তবে নানা চরিত্রে তিনি নিজেকে বারবার প্রমাণ করেছিলেন কতটা দক্ষ অভিনেত্রী তিনি। জীবন থেকে নেওয়ায় যেই খান আতার সাথে জুটি বেঁধে অভিনয় দর্শকরা উপভোগ করেছিলেন, তার ঠিক কয়েক বছর পরেই সুজন সখিতে খান আতার মায়ের চরিত্রে নিজেকে দারুন ভাবে মানিয়ে নিয়েছিলেন। সুজন সখি শুধু নায়ক-নায়িকার ছবি নয়, এর বাইরে যে দুইটি চরিত্র বেশ গুরুত্ব পেয়েছে তা হল খান আতা ও রওশন জামিলের চরিত্র। সুজন সখির দাদীর চরিত্রে যে মায়াভরা অভিনয় করেছিলেন তা অতুলনীয়।

‘নানী গো নানী বলি যে আমি, আমারে নিয়ে লইয়া যাবা ভাইসাবের বাড়ি’, আমজাদ হোসেনের বিখ্যাত ছবি ‘নয়ন মণি’তে ববিতার সেই নানী হচ্ছেন রওশন জামিল। নয়ন মনিতেও মূল অভিনয়শিল্পীর বাইরে বেশি গুরুত্বপূর্ণ পেয়েছিল এই নানী চরিত্রটি। দাদী- নানী চরিত্র শুধু নিছক মজার চরিত্র নয়, উনি সেটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।

নয়ন মনিতে অভিনয় করেই প্রথম জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে যখন রঙ্গীন নয়ন মনি নির্মিত হয়,সেখানেও তিনি শাবনূরের নানী হয়েছিলেন যা বিরল অর্জন বটে। নানী গো নানী গানটি আবার ব্যবহৃত হয়েছিল গোলাপী এখন ঢাকায় ছবিতে, সেখানেও চম্পার নানী তিনি।

আমজাদ হোসেনের আরেক যুগান্তকারী সিনেমা ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’। সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকে এই সিনেমার একটি দৃশ্য বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। ‘লাভ হয় না দশ ট্যাকা, টিকিট কাটুম সাত ট্যাকা’, বিড়ি ফুঁকে সেই বয়স্কা দাদীর চরিত্র রওশন জামিল ই করেছিলেন। শুধু এইটুকু অংশ ই নয়, পুরো ছবিতে তিনি ববিতা ও আনোয়ারার দারুণ সঙ্গী হয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধের ছবি ‘ওরা ১১ জন’ এরও অন্যতম অভিনেত্রী তিনি।

বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ল্যাসিক চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’, এই সিনেমায় শফির মা চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় ওনার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অর্জন। ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, দহন, পোকামাকড়ের ঘর বসতি, পেনশন, টাকা আনা পাই- এই সিনেমাগুলোতে যেমন মমতাময়ী মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তেমনই চিরাচরিত বাণিজ্যিক ধারার ছবি ‘আমার সংসার’ এ-ও খল চরিত্রে দর্শকদের আরেকবার চমক দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যবসাসফল ছবি ‘বেদের মেয়ে জোছনা’তেও তিনি অভিনয় করেন নানীর চরিত্রে, ‘মিস লোলিতা’ ছবিতে মেথরানী চরিত্রে মুগ্ধ করেছিলেন। সিনেমার পাশাপাশি অনেক নাটকেই অভিনয় করেছিলেন, সেগুলোর মধ্যে কূল নাই কিনার নাই, সকাল সন্ধ্যা, ঢাকায় থাকি, তালা অন্যতম। খুব সম্ভবত সর্বশেষ মুক্তি পাওয়া সিনেমা ‘প্রেমের তাজমহল’।

বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে বহুমাত্রিক অভিনয় করলেও জুরি বোর্ড সেভাবে তাঁর প্রতি সুবিচার করতে পারেনি। বেঁচে থাকাকালে একটিমাত্র জাতীয় পুরস্কারই তিনি পেয়েছিলেন, মৃত্যুর পর চিত্রা নদীর পাড়ে সিনেমার জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। চিত্রা নদীর পাড়ে সিনেমাতে বিধবা পিসির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, যিনি দেশভাগের করুণ যন্ত্রনার শিকার হয়ে মাতৃভূমি ছেড়েছিলেন।

স্বামী বিখ্যাত নৃত্য পরিচালক গওহর জামিলের সাথে। ছবি: সংগৃহীত

অভিনেত্রীর বাইরে তিনি নৃত্যশিল্পী ছিলেন, স্বামী বিখ্যাত নৃত্য পরিচালক গওহর জামিল। দুইজন ই নৃত্য সংগঠক ছিলেন। এই নৃত্যে অবদানের জন্যই ১৯৯৫ সালে একুশে পদক পেয়েছিলেন। বেঁচে থাকাকালীন এই সম্মাননা পেয়েছিলেন, তা আমাদের দেশে সৌভাগ্যের ব্যাপার বটে।

রওশন জামিল ১৯৩১ সালের ৮ মে, ঢাকার রোকনপুরে, জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম ডাঃ এম এ করীম এবং মায়ের নাম মোসামৎ হুসনে আরা করীম। তাঁরা ছিলেন চার ভাই, চার বোন। তাঁর বোনদের মধ্যে আল্পনা মুমতাজ বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান নৃত্য শিল্পী।

তিনি ঢাকার লক্ষীবাজারের সেন্ট ফ্রান্সিস মিশনারী স্কুলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপরে পড়াশোনা করেন ইডেন কলেজে।

শৈশব থেকেই রওশন জামিলের নাচের প্রতি ঝোঁক ছিল। ম্যাট্রিক পাশ করার পর নাচ শেখার জন্য ভর্তি হন ঢাকার ওয়ারী শিল্পকলা ভবনে। প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যশিক্ষক গওহর জামিল-এর কাছ থেকে তিনি নাচের তালিম নেন । পরে তিনি ভারত থেকে নৃত্যের উপর ডিপ্লোমা করেন। সাথে যুক্ত হন মঞ্চ ও রূপালি পর্দায় অভিনয়েও। ছিলেন টিভির প্রিয়মুখও।

প্রখ্যাত এই অভিনেত্রী ২০০২ সালের ১৪ মে, ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। প্রয়াত এই গুণি অভিনেত্রী-নৃত্যশিল্পীর প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। অবিস্মরণীয় কালজয়ী এই অভিনয়শিল্পীর কাছে, আমাদের চলচ্চিত্র তথা শিল্প-সংস্কৃতির ঋণ অশেষ।

 

Link copied!