হিন্দি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী অভিনেতা দিলীপ কুমার মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বুধবার (০৭ জুলাই) সকাল সোয়া ৭টার দিকে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. জলিল পার্কারের বরাত দিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে। মৃত্যুকালে বর্ষীয়ান এই অভিনেতার বয়স হয়েছিল ৯৮ বছর। তিনি স্ত্রী অভিনেত্রী সায়রা বানুসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
অভিনেতা দিলীপ কুমারের পারিবারিক বন্ধ হিসেবে পরিচিত ফয়সাল ফারুকিও অভিনেতার টুইট অ্যাকাউন্ট থেকে টুইট করে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

অফিশিয়াল টুইট বার্তায় ফারুকি জানান, ‘ভারাক্রান্ত মন নিয়ে গভীর শোকের সঙ্গে জানাচ্ছি যে কয়েক মিনিট আগে প্রিয় দিলীপ সাহেব ইন্তেকাল করেছেন৷ আমরা আল্লাহর কাছ থেকে এসেছি এবং তাঁর কাছেই ফিরব৷’
বেশ কয়েকদির ধরে শরীরটা ভাল যাচ্ছিলো না এই অভিনেতার। শ্বাসকষ্ট নিয়ে মঙ্গলবার (২৯ জুন) রাতে মুম্বাইয়ের হিন্দুজা হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল ৯৮ বছর বয়সী এই লিজেন্ড অভিনেতাকে। ওই হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ওইসময় স্ত্রী সায়রা বানু তার পাশে ছিলেন।
ওই সময় সায়রা বানু গণমাধ্যমে বলেন, ‘দিলীপ কুমারের শারিরীক অবস্থা এখনও স্থিতিশীল রয়েছে। তিনি এখনও আইসিইউ’তে আছেন। আমরা তাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে চাই। আমরা এ ব্যাপারে চিকিৎসকদের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করছি। তার চিকিৎসা ব্যবস্থার ব্যাপারে চিকিৎসকরা অবগত আছেন এবং যত দ্রুত তারা অনুমতি দিবে তথনই আমরা বাড়িতে নিয়ে যাব্। আজ (শনিবার) তাকে ছঅড়পত্র দেবে না।’ দিলীপ কুমারের দ্রুত আরোগ্যর জন্য ভক্তদের প্রার্থণাও কামনা করেন সায়রা বানু। এর আগে, গত ৬ জুন শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়েই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন দিলীপ কুমার। চিকিৎসায় সুস্থ হয়েগত ১১ জুন তিনি ছাড়া পান।
কিংবদন্তী অভিনেতার মৃত্যুর খবরে গোটা বলিউড ইন্ড্রাস্ট্রিজের পাশাপাশি গভীরভাবে শোকাহত হয়েছেন অনেকে। এই তালিকায় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুরু করে রাজনীতির লোকজনও রয়েছেন৷ এরই মধ্যে প্রবীণ অভিনেতার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি৷

এক টুইটার বার্তায় তিনি লেখেন, ‘চলচ্চিত্র জগতের কিবদন্তী হিসেবে স্মরণীয় থাকবেন দিলীপ কুমার জি৷ অতুলনীয় মেধার আশীর্বাদধন্য তিনি৷ যে কারণে দশকের পর দশক ধরে দর্শকরা তাঁর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছেন৷ তাঁর মৃত্যু আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের বিরাট ক্ষতি৷ পরিবার, পরিজন, বন্ধুবান্ধব ও অনুরাগীদের জন্য সমবেদনা রইল৷’
দিলীপ কুমারের প্রকৃত নাম ইউসুফ খান। তার জন্ম বর্তমান পাকিস্তানের পেশোয়ারে। পরে তিনি চলে আসেন মহারাষ্ট্রের নাসিকে। তারপর পুনে হয়ে মুম্বেইয়ে। ১৯৪৩ সালে তিনি মুম্বাইয়ের টকিজের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। প্রথমে লেখা ও স্ক্রিপ্ট লেখায় সাহায্য করতেন। মাস গেলে বেতন পেতেন ১ হাজার ২৫০ টাকা। পরবর্তীতে বোম্বে টকিজের স্বত্বাধিকারী দেবিকা রানী তাকে অভিনেতা হওয়ার প্রস্তাব দেন। ওই সময় ইউসুফ খান থেকে হয়ে যান দিলীপ কুমার।

১৯৪৪ সালে মুক্ত পায় দিলীপ কুমার অভিনীত প্রথম ছবি ‘জোয়ার ভাটা’। প্রথম দিকে দিলীপ কুমারের কয়েকটি ছবি ফ্লপ করে। ‘জোয়ার ভাটা‘ছবির তিন বছর পর ১৯৪৭ সালে মুক্তি পায় ‘জগনু’ চলচ্চিত্রটি। শওকত হোসেন রিজভী পরিচালিত এই ছবিটি ছিল ওই বছর সর্বাধিক উপার্জনকারী। ছবিটিতে দিলীপ কুমারের বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন অভিনেত্রী নূর জাহান।
মুঘল-এ-আজম
ভারতের চলচ্চিত্র জগতের ইতিহাসে অন্যতম ব্যবসাসফল সিনেমা মুঘল-েএ-আজম তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

ভারতের প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক আসিফ করিম পরিচালতি এই ছবিটি ১৯৬০ সালে মুক্তি পায়। মুঘল শাহজাদা সেলিমের সাথে মহলের নতর্কী আনারকলির প্রেমকে ঘিরে সম্রাট আকবরের সাথে মনোমালিন্য ও যুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে তৈরি চলচ্চিত্রটি সুপার ডুপার হিট হয়।

দিলীপ কুমার, মধুবালা ও পৃথ্বীরাজ কাপুর অভিনীত ভারতের এই ব্লকবাস্টার ছবিটি ওই সময়ের বক্স অফিসের যাবতীয় রেকর্ড ভেঙ্গে দেয়। এই চলিচ্চত্রিট শুধু হিন্দি ছবির জগতে একটা মাইল ফলক নয়, দিলীপ কুমারের অভিনয় জীবনেরও বড় সাফল্য।

ছয় দশকের অভিনয় জীবনে ‘মধুমতি’, ‘দেবদাস’, ‘মুঘল-এ-আজম’, ‘গঙ্গা যমুনা’, ‘রাম অউর শ্যাম’, ‘কর্ম', 'বাবুল’, ‘মেলা’, ‘দিদার’ এর মতো অসংখ্য উল্লেখযোগ্য সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। বড় পর্দার ট্রাজেডি কিং হিসেবে আলাদা খ্যাতি পাওয়া অভিনেতা দিলীপ কুমার ১৯৯১ সালে ভারত সরকারের কাছ থেকে ‘পদ্মবিভূষণ’ খেতাব পেয়েছেন। এরপর তিনি দাদাসাহেব ফালকে অ্যাওয়ার্ডও অর্জন করেন।