উচ্চ মন্দ ঋণের বোঝা নিয়ে চলছে সরকারি ও বেসরকারি মোট ১১ ব্যাংক। এর মধ্যে ৪টি সরকারি ও ৭টি বেসরকারি ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসেবে খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ অগ্রণীতে ১৪ হাজার ৮১০ কোটি টাকা, জনতা ১৪ হাজর ৩৮৭ কোটি টাকা, সোনালি ১২ হাজার ৫ কোটি টাকা ও বেসিক ৭ হাজর ৬০৪ কোটি টাকা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৬ হাজার ৪৬০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, যা ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ২০ দশমিক ২৮ শতাংশ। এর মধ্যে মন্দ ঋণই রয়েছে ৫৩ হাজার ২১১ কোটি টাকা বা ৯৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। মন্দ ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। এ প্রভিশন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে জানা যায় রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের মধ্যে ৫টিই মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ঘাটতি অগ্রণী ব্যাংকের, প্রায় ৩ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা।
বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৬৬ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। শীর্ষ খেলাপি ঋণের ভারে চলা ৭ বেসরকারি ব্যাংক হলো ন্যাশনাল ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক।
এসব ব্যাংক ঋণ-আমানতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণ করেছে। ব্যাংকগুলোর দুর্বল হয়ে পড়া আর্থিক পরিস্হিতি যাতে আরও খারাপ না হয় সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব ব্যাংকিং কোম্পানী তে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে।
বিদ্যমান বিধান অনুসারে, শিডিউল বা প্রচলিত ধারার ব্যাংক সংগৃহীত আমানতের সর্বোচ্চ ৮৭ শতাংশ এবং ইসলামী ব্যাংক সর্বোচ্চ ৯২ শতাংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে পারে। এটি এডিআর বা এ্যাডভান্ডিস ডিপোজিট রেশিও হিসেবে পরিচিত।
গত মার্চ ২০২৩ তারিখ পর্যন্ত তথ্যে জানা যায়, এডিআর সীমা লঙ্ঘনে সবার শীর্ষে ছিল ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির এডিআর সীমা উঠেছে রেকর্ড ১০৬ দশমিক ১২ শতাংশে। এডিআর সীমা লঙ্ঘনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। এ ব্যাংকের এডিআর সীমা ১০০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের এডিআর ১০০ দশমিক ০৩ শতাংশ। এ ছাড়া এবি ব্যাংকের ৯৯ দশমিক ৬০ শতাংশ, এক্সিম ব্যাংকের ৯৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৯৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ, স্যোশাল ইসলামী ব্যাংকের ৯৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ৯৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ, আইএফআইসি ব্যাংকের ৮৯ দশমিক ২৬ শতাংশ, ওয়ান ব্যাংকের ৮৮ দশমিক ৫২ শতাংশ ও ঢাকা ব্যাংকের ৮৭ দশমিক ০৩ শতাংশ এডিআর রয়েছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকায়, যা ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ছিল ১ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।
গত বছরের জুন শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। ফলে গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৯ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। এর বাইরে বিদেশি ব্যাংকের ২ হাজার ৯৭০ কোটি ও বিশেষায়িত ব্যাংকের ৪ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে। ডিসেম্বর ২০২২ শেষের হিসেবে অবশ্য খেলাপি ঋণের পরিমান একটু কম দেখা গেছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মূদ্রা তহবিল (আইএমএফ)'র ঋণের শর্তপূরণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার চাপ রয়েছে। এ অবস্থায় খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বাংলাদেশ ব্যাংকর পক্ষ থেকে আইএমএফকে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন মন্ত্রিসভায় পাস হওয়ার ক্ষেত্রে সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কেও আইএমএফ কে অবহিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের পক্ষ থেকে আইএমএফকে ২০২৬ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। আর বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে তা ৫ শতাংশের মধ্যে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফকে দেওয়া ব্যাখ্যায় বলে, বর্তমানে ব্যাংক খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৫ লাখ কোটি টাকা। এই ঋণের ৮০ শতাংশের খেলাপি হার ৫ শতাংশের নিচে। বাকি ২০ শতাংশ ঋণের খেলাপি হার অনেক বেশি। আর এই ২০ শতাংশের বড় অংশই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর। ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়, ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ৮০ শতাংশ ঋণ থেকে নিয়মিত আয় হচ্ছে ব্যাংকগুলোর। আর উচ্চ খেলাপির কারণে বাকি ২০ শতাংশ ঋণ থেকে কোনো আয় নেই।