ঈদে মোটরসাইকেল না চলায় যানবাহনে বাড়তি লেনদেন ২০০ কোটি টাকা

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

জুলাই ৪, ২০২২, ১০:৩৬ পিএম

ঈদে মোটরসাইকেল না চলায় যানবাহনে বাড়তি লেনদেন ২০০ কোটি টাকা

বাংলাদেশে কোরবানির ঈদের সময় দুর্ঘটনা এড়াতে সরকার মহাসড়কে মোটরবাইক চলাচল নিষিদ্ধ করে। কিন্তু মোটরসাইকেলের যাত্রী ও চালকদের অভিযোগ, বাস মালিকদের ব্যবসার সুবিধা করে দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কেননা প্রতি বছরই মোটরসাইকেলের কারণে বাসের অনেক সিট ফাঁকা যাচ্ছে।

রবিবার বিকালে ওই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর সামাজিকমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান মোটরবাইক চালকরা। তারা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য অনুরোধও করেছেন। আর পরিবহন মালিকরাও বলছেন, কর্তৃপক্ষের ওই সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক নেই।

ঈদে মোটরসাইকেলের যাত্রী ২৫ লাখ

রোজার ঈদে গণপরিবহনের বিকল্প হিসাবে ঢাকা থেকে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ মোটরবাইকে চড়ে বিভিন্ন জেলায় গেছেন; আর এই সময়ে ১২৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫৬ জনের প্রাণ গেছে বলে উঠে এসেছে রোড সেইফটি ফাউন্ডেশনের এক জরিপে।
তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মহাসড়কগুলো মোটরবাইকের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বাহন চলাচলের উপযুক্ত নয়। সরকার মহাসড়কে দুর্ঘটনার তথ্য পর্যালোচনা করে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ সেসব তথ্যে দেখা গেছে, গত ঈদুল ফিতরের সময় সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনার এক-তৃতীয়াংশই ঘটেছে মোটরসাইকেলের কারণে।

২০০ কোটি টাকা বেশি লেনদেন

মোটর সাইকেল না চলাচলের কারণে ২৫ লাখ যাত্রী দুই দফা বাস ও অন্যান্য যানবাহন দিয়ে চলাচল করবে। গড়ে ৪০০ টাকা ভাড়া হলেও অন্য যানবাহনে প্রায় ২০০ কোটি টাকা যোগ হবে। বাস মালিক সমিতির কারসাজিতেই এমন ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন বাংলাদেশে যাত্রী কল্যাণ সমিতির উপদেষ্টা শরিফুজ্জামান শরীফ। তিনি বলেন, মোটরসাইকেল ব্যতীত অন্য যানবাহন দুর্ঘটনায় পড়ে। তাই বলে সেগুলোর বিরেুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় কি?

তিনি আরও বলেন, সরকারের নেতৃত্ব পর্যায়ে বাস মালিকদের অনেক নেতা বসে আছে। তাই তারা সহজেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

প্রভাব পড়বে না বাসে

তবে মহাসড়কে মোটরবাইক বন্ধের পেছনে পরিবহন কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে কোন চাপ বা অনুরোধ করা হয়নি বলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, 'মোটরবাইক বন্ধ করার জন্য আমাদের কোন দাবি ছিল না বা আমরা অনুরোধও করিনি। মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে সরকার নিজে থেকেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মোটরসাইকেল চললেও ঈদের সময় গাড়ি ফাঁকা থাকে না। তাই এই নিয়ে আমরা কোন ধরনের মতামত দেইনি।’

বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, 'মোটরসাইকেল কিন্তু মহাসড়কের যানবাহন নয়। মহাসড়ক হচ্ছে বাসের মতো দ্রুতগতির যানবাহন। একটি পরিবার যখন মোটরসাইকেলের করে যায়, তার দিয়ে দ্রুত গতির একটি বাস গেলেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।'

মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনা বাড়ছে কেন

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়।

বেসরকারি রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে যত দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার ৩৯ শতাংশই মোটরসাইকেলের কারণে হয়েছে।

তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে ২ হাজার ৭৮টি মোটর সাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। তার মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ২১৪ জনের। দুই হাজার কুড়ি সালের তুলনায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে ৫০ শতাংশ, মৃত্যু বেড়েছে ৫১ শতাংশ। নিহতদের বেশিরভাগের বয়স ৩০ বছরের নীচে।

কেবলমাত্র জুন মাসেই মোটরবাইক দুর্ঘটনায় ২০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। জুন মাসে সড়ক দুর্ঘটনার হিসাবে এই হার ৪২ শতাংশ।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল ব্যবহৃত হয়, এমন ১৬টি দেশের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট দেখতে পেয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার মোটরসাইকেলের বিপরীতে ২৮.৪ জন নিহত হচ্ছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এদের ৪০ শতাংশের বয়স ২৪ থেকে ৩০ বছর।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এস এম সালেহ উদ্দিন বলছেন, 'আমাদের মহাসড়কগুলোয় মোটরবাইক বন্ধ করার জন্য আমরা তো অনেকদিন ধরেই সুপারিশ করে আসছি। কারণ এসব বাহন স্বল্প দূরত্বের জন্য ঠিক আছে, কিন্তু লম্বা পথ বা মহাসড়কের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে দুর্ঘটনা কমাতে মহাসড়কে মোটরবাইক চলতে না দেয়াই ভালো।’

Link copied!