এপ্রিল ২৫, ২০২৩, ০৬:০৬ পিএম
সফররত আন্তর্জাতিক মূদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর প্রতিনিধি দলের সাথে দফায় দফায় মিটিং শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূখপত্র মেজবাউল হক সাংবাদিকদের জানান, রিজার্ভ নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনও কারন নেই। এক প্রশ্নের জবাবে মূখপাত্র বলেন, "এই মূহুর্তে রিজার্ভ নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনও কারন দেখছি না।"
তিনি বলেন, "আজ মঙ্গলবার ৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আছে। এছাড়াও ব্যাংকগুলোর কাছে সাড়ে ৩ বিলিয়ন সমমূল্যের বৈদেশিক মূদ্রা আছে। এটি দিয়ে ব্যাংকগুলো নিজেদের ব্যবসায়িক প্রয়োজন বা আমদানী ঋণপত্র খুলতে কাজে লাগাবে। সামনে রিজার্ভ থেকে আমদানীর বিপরীতে শুধু এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন বা (এসিইউ) একটি পেমেন্ট যাবে। তাতে খুব একটা হেরফের হবে না রিজার্ভে।"
মেজবাউল হক বলেন, "অনেক বৈদেশিক মুদ্রা পাইপলাইনে আছে। বাজেট সহায়তা হিসেবে বিশ্বব্যাংক এর কাছ থেকে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ খুব শীঘ্রই অনুমোদন হয়ে যাবে। তাছাড়া, আইএমএফ, জাইকা সহ আরও অনেক এগ্রিমেন্ট সামনে হবে। এসব প্রক্রিয়া চুড়ান্ত হবার পথে। সুতরাং এসব বৈদেশিক মূদ্রা রিজার্ভে যোগ হবে।"
আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সাথে বৈঠকে আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক মূখপত্র বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতির সব বিষয় নিয়েই আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে আর্থিক খাতে আছে রিজার্ভ পরিস্হিতি, ডলারের রেট, ঋণের সুদহার, খেলাপী ঋণ পরিস্হিতি ও এ সম্পর্কিত আইনের প্রস্তাবিত সংস্কার, রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি ও চলতি বাজেটের অগ্রগতি ও আগামী বাজেটের সম্ভাব্য প্রস্তাবনাসমূহ।
প্রবাসী আয়ে নয় শতাংশ গ্রুথ হয়েছে উল্লেখ করে মূখপত্র জানান, অদ্যাবধি রেমিট্যান্স প্রবাহ সন্তোষজনক। আগামী দিনগুলোতে বৈদেশিক রেমিট্যান্স এর প্রবাহ ধরে রাখতে ব্যাংকগুলোকে উদ্যোগী হয়ে কাজ করতে হবে।
রেমিট্যান্সের সাথে রিজার্ভ এর কোনও সম্পর্ক নেই উল্লেখ করে মেজবাউল হক বলেন, "কেউ কেউ ভূল করে রিপোর্ট করেন রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও রিজার্ভ বাড়েনি। এটি ভূল।"
তিনি বলেন, আগামী জুন থেকে ঋণের সুদহারের সিলিং থাকছে না। এছাড়া ডলারের বিনিময় রেট ও একক করা হবে।
মূখপত্র বলেন, "এখনও একক রেট হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ১০৩ টাকা দরে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য নির্ধারণ করে আসছে। তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ ঠিক রাখতে সরকার ঘোষিত প্রনোদনা র কারনে প্রতি ডলারের বিনিময়ে প্রবাসী আয়ের বেনিফিসিয়ারীরা আড়াই টাকা করে বেশী পাচ্ছে। এটি ডলারের বিনিময় মূল্য নয়।"
তিনি বলেন, খেলাপী ঋণ আদায় ও ঋণখেলাপীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যাংক কোম্পানী আইনের সংশোধন মন্ত্রীসভায় পাশ হয়ে এখন সংসদে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এসব বিষয় আইএমএফ স্টাফদের অবগত করা হয়েছে।"
মূখপত্র উল্লেখ করেন, সদস্যদেশ হিসেবে আইএমএফ বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়মিত তদারকি করে থাকে। "এটি আইএমএফ স্টাফ ভিজিট। এ ভিজিটে আইএমএফ প্রতিনিধিদল সার্বিক অর্থনীতির চিত্র নিয়ে রিপোর্ট করবে এবং এর সাথে চলমান ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের আলাদা কোনও সম্পর্ক নেই।"
গত ফেব্রুয়ারীতে বাংলাদেশের জন্য অনুমোদিত ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের প্রথম কিস্তি বিতরনের আড়াইমাস পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর ডেলিগেশন মঙ্গলবার ঢাকায় আসে শর্ত বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করতে।
অর্থ মন্ত্রনালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক সুত্র জানায়, আইএমএফ আগামী জুনে বাংলাদেশের পরবর্তী বাজেটে আর্থিক খাত সংস্কারের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত প্রকল্প সমূহ সম্পর্কেও ধারনা পেতে এ সফরে এসেছে।
তবে, ঢাকা সফরে আইএমএফে’র এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দ ৮ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেয়ার কথা ছিলো। কিন্ত তিনি আসতে পারেন নি।
কারন হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক মূখপত্র বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্র সফরে বিশ্বব্যাংকে যাবেন এবং সেখানে আগামী বাজেট সহায়তা নিয়ে আলোচনা করবেন। এসময় আইএমএফ কর্মকর্তারাও উপস্হিত থাকার কথা রয়েছে। তাই রাহুল আনন্দ পরে ঢাকায় এসে সফররত প্রতিনিধিদলের সাথে যোগ দিবেন।
এদিকে, ২৫শে এপ্রিল থেকে ২রা মে পর্যন্ত সফরে আইএমএফ প্রতিনিধিগণ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। অর্থ মন্ত্রণালয় সুত্র জানায়, প্রতিটি বাজেট ঘোষণার আগে আইএমএফের একটি মিশন ঢাকায় আসে।
সূত্র থেকে আরও জানা যায়, এখন যেহেতু তাদের সঙ্গে ঋণ কর্মসূচি চলছে, তাই বাজেট সহায়তার পাশাপাশি ঋণের শর্ত পূরণের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসবে।
গত জুলাইয়ে বাংলাদেশ আইএমএফ এর কাছে ঋণ সহায়তার আবেদন জানালে রাহুল আনন্দের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করে স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনাপূর্বক একটি রিপোর্ট দেয়। এরপর আইএমএফ জানুয়ারীতে একটি স্টাফ রিপোর্ট কে রেফারেন্স ধরে বাংলাদেশের অনুকূলে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণপ্রস্তাব অনুমোদন করে। এর মধ্যে এক্সটেন্ডেড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি (ইসিএফ) এবং এক্সটেন্ডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি (ইএফএফ) এর অধীনে প্রায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং রেজিলেন্স এন্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি ফর বাংলাদেশ’র অধীনে প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করা হয়।
আইএমএফের দেওয়া মোট ৩৮ টি শর্তের মধ্যে রয়েছে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করা, আদায়ের অযোগ্য ঋণ বিষয়ে আলাদা কোম্পানি গঠন করা, জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ফর্মুলা কার্যকর করা, আয়কর আইন সংসদে পাস করা, করছাড়ের ওপর বিস্তারিত নিরীক্ষা করা, সাবসিডি হ্রাস ও বাজেটের নির্দিষ্ট অংশ সামাজিক ব্যয়ের (শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা কমূর্সচি) জন্য রাখা এবং ক্রমান্বয়ে তা বাড়ানো।
গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬২ লাখ ৭০ হাজার ডলার পায়।ঋণের বাকি অর্থ পাওয়া যাবে তিন বছরে অর্থাৎ ছয়টি সমান কিস্তিতে ৩৬ মাসে।সে হিসেবে শেষ কিস্তি পাওয়া যাবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। পরবর্তী কিস্তি প্রতিটির পরিমাণ ৭০ কোটি ৪০ লাখ ডলার।