ডলারের দামে অসামঞ্জস্যতার পর বিদ্যুৎ সংকটের ফলে উৎপাদন ও যথাযথ মূল্য নিয়ে শঙ্কায় ছিল ব্যবসায়ীরা। কিন্তু দেশে হঠাৎ তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে বিশ্ববাজারে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকা কষ্টকর হবে। নতুন ক্রয়াদেশ আসা নিয়ে শঙ্কার পাশাপাশি পুরাতন আদেশগুলোতে প্রচুর ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে বলে জানায় তারা।
শঙ্কা বেশি পোশাক খাতে
পোশাক খাতে মাসখানেক ধরে গ্যাস সংকট চলছে। এরপরপরই বিদ্যুৎ সংযোগের সমস্যা থাকার কারণে জেনারেটরের ব্যবহার বৃদ্ধি করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দেশে পরিবহন ভাড়া বাড়বে, ট্রাক ভাড়া বাড়বে, জিনিসপত্রের দাম বাড়বে, বাড়বে মুদ্রাস্ফীতি। এসবের সঙ্গে শ্রমিকদের বেতনও বাড়াতে হবে। লস থেকে বেঁচে থাকতে হলে অনেক কারখানা বন্ধ করা ছাড়া কেনো উপায় থাকবে না।
তিনি আরও বলেন, রপ্তানি আয়ের ৮২ শতাংশই এসেছে পোশাক খাতের মাধ্যমে। এ কারণে এখনও মুদ্রাস্ফীতি আমাদের সেভাবে বাড়েনি। কিন্তু নতুন করে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির ফলে বিশ্ববাজারে আমাদের টিকে থাকা কষ্টকর হবে। দেশের স্বার্থে এই মুহূর্তে প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে হলেও তেলের দাম স্থিতিশীল রাখা উচিত ছিল।
উৎপাদন কমেছে অর্ধেক
চলতি মাসের শুরুতে গ্যাস-সংকটে নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও গাজীপুরের বস্ত্রকলগুলোর উৎপাদন ২০-৬০ শতাংশ কমে যায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, ঈদের পর সব কারখানা এখনো পুরো মাত্রায় উৎপাদনে যায়নি। আগামী সপ্তাহে প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাবে। সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, শিল্পে গ্যাস দেওয়ার ক্ষেত্রে যেন অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তা না হলে রপ্তানি ব্যাহত হবে।
দুই বছর আগেও নিটের চেয়ে ওভেন পোশাক রপ্তানি বেশি হতো। বিদায়ী অর্থবছর ওভেনের চেয়ে ৩৮২ কোটি ডলারের নিট পোশাক রপ্তানি বেশি হয়েছে। ওভেন পোশাক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাপড়ের বড় অংশ আমদানি করতে হয়। আর নিট পোশাকের ৯৫ শতাংশ কাপড় দেশেই হয়। সেই কাপড় উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে গ্যাসের প্রয়োজন হয়।
নারায়ণগঞ্জের নিট কারখানাগুলোতে দিনের বেলা গ্যাসের চাপ ২-৩ পিএসআইয়ের বেশি থাকছে না। সে কারণে কাপড় রং করা ৫০ শতাংশ কমে গেছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে দাবি করে বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ক্রয়াদেশ কমার পাশাপাশি আমাদের নতুন দুশ্চিন্তা গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ থেকে বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো যেন কোনো ধরনের অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত না পায়, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তার জন্য শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং কাঁচামাল আমদানির জন্য পর্যাপ্ত ডলার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
পোশাকের ক্রয়াদেশেও ভাটার টান
বর্তমানে কারখানাগুলোতে শীতের পোশাক তৈরি হচ্ছে। একই সাথে আগামী বসন্ত ও গ্রীষ্মের ক্রয়াদেশ আসার সময়ও এখন। গত বছর করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় এ সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রচুর ক্রয়াদেশ এসেছিল। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ থেকে পোশাকের ক্রয়াদেশ কম আসছে। আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে তার নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।