স্বাস্থ্য ধরে রাখতে, ফিগার সুন্দর রাখতে কত কিই না করছি প্রতিদিন! মুখরোচক পছন্দের খাবার এর লোভ সামলে বিস্বাদ খাবারগুলো দেদারছে গিলছি। কিন্তু দিনশেষে হচ্ছি হতাশ। এতসব কষ্টের ফলাফল শূন্য না হলেও ঠিক আশানুরুপ নয়। ঠিক বলেছি কি? যদি আমার কথার সাথে আপনাদের সমস্যা মিলে যায়, তাহলে এর পেছনের কারণ ও সমাধান খঁজার উপায়ও আছে।

সব অঞ্চলের মানুষের শরীরের ধরণ এক রকম নয়। এটা আমরা সবাই জানি। একজন আফ্রিকানের স্বাস্থ্যের যে চাহিদা একজন দক্ষিণ এশীয়র কিন্তু তাঁর চেয়ে ভিন্ন। ১২০ বছরে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ভারতবর্ষে প্রায় ৩১ টির মতো দুর্ভিক্ষ রেকর্ড করা হয়েছিল। অনাহারের সাথে লড়াই করেই অভিযোজিত হয়ে তারা আজকের অধিবাসী। অর্থাৎ আমরা।
দুর্ভিক্ষগুলোতে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের পূর্ব পুরুষদের সেই পরিস্থিতির সাথে অভিযোজিত হতে হয়েছে। অভিযোজনের জন্য তারা অতিরিক্ত ক্যালরি তাদের শরীরে সঞ্চয় করতেন। এবং যখন ক্ষুধার্ত অবস্থায় থাকতেন তখন সঞ্চিত সেসব ক্যালরি খরচ হত। ঠিক এই কারনেই এপিজেনেটিক্যালি দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে চর্বি তৈরি এবং সঞ্চয় করার প্রবণতা রয়েছে।

একটি প্রজন্মের দ্বারা অনুভুত আঘাত বা কষ্ট এপিজেনেটিক্সের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের ওপর শারীরিক ও মানসিক প্রভাব বিস্তার করে। ঠিক এই কারনেই অনাহারে ভুক্তভোগি পরবর্তী প্রজন্মের ডায়াবেটিস এবং স্থূলতার ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়। নাতি-নাতনিদের মধ্যে কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকিও দুই দশমিক সাত গুণ বেড়ে যায়। ইউরোপীয়দের তুলনায় দক্ষিণ এশীয়দের ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা ৬ গুণ বেশি। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেটন ইন্টারভেনশনাল রেডিওলজি’র প্রেসিডেন্ট ও সহপ্রতিষ্ঠাতা ড. মুবিন সাইয়্যিদ এসব কথা বলেন।
তাঁর দেয়া তথ্যের সাথে একমত পোষন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের চেয়ারপারসন ড. সাবিনা ইয়াসমিন। তাঁর ভাষ্যমতে , পূর্ব পুরুষরা কোনো কষ্ট ভোগ করলে বা কোনো অভ্যাসে অভ্যস্ত থাকলে তাঁর প্রভাব অবশ্যই পড়বে পরবর্তী প্রজন্মের ওপর। এবং এপিজেনেটিক্সের কারনেই এমনটা হয়ে থাকে।

আন্তর্জাতিক রেডিওলজিস্ট ডা। মুবিন সৈয়দের মতে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভোগান্তি থেকে আমরা উত্তরন ঘটাতে পারি? আমাদের একটি অনন্য ফিজিওলজি আছে। তাই আমাদের শরীরের সাথেও সে অনুযায়ী আচরণ করতে হবে। প্রথমেই আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে এটি একটি সমাধানযোগ্য সমস্যা।

কলোনাইজেশনের আগে, দক্ষিণ এশিয়ায় শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি জটিল স্বাস্থ্য অনুশীলন ছিল। দক্ষিণ এশীয়দের চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল খুব উন্নত । আইয়ুর্বেদ, ইউনানি ওষূধ ও যোগব্যামের মত চিরাচরিত ব্যাপারপগুলো এখন প্রায় হারিয়েই গেছে। ভবিষ্যত প্রজন্মের হৃদরোদ, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য স্থূলতাজনিত রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আইয়ুর্বেদ, ইউনানি ওষূধর পাশাপাশি জীবনধারায় কিছু পরিবর্তন আনা বাধ্যতামূলক।

নিয়মিত যোগব্যামের অনুশীলন করা তার মধ্যে অন্যতম। ইয়োগা বা যোগব্যায়াম একটি শাস্ত্রীয় কৌশল, যা পাঁচ হাজার বছরের পুরনো। প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের মুনি ঋষিরা তাদের স্বাস্থ্য ঠিক রাখা এবং দীর্ঘজীবনের জন্য বিভিন্ন কলা-কৌশল আবিষ্কার বা আয়ত্ত করেন। ওজন কমানো, শক্তিশালী নমনীয় শরীর, উজ্জ্বল ত্বক, শান্ত মন, ভালো স্বাস্থ্য ইত্যাদি যা কিছু আমরা পেতে চাই সব কিছুর চাবি আছে যোগাসনে। অর্থাৎ আমাদের সেই শেকড়েই ফিরে যেতে হবে।

আমাদের পূর্ব পুরুষদের যে জীবনধারা ছিল, আমাদের জীবনধারা তাঁর চেয়ে আকাশ পাতাল ভিন্ন। তাদের কর্মঠ জীবনধারার সাথে সম্পৃক্ত খাদ্যাভাসের যে মিশেল ছিল, তা তাদের সুস্থ রাখতো। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে কি হয়? আমরা দিনের বেশগিরভাগ সময় কাটাই রাস্তায়, দূষিত পরিবেশে। হয়তো সারাদিন চেয়ারে বসে স্ক্রিনের সামনেই আমাদের কাজ।

আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের মত শারীরিক ভাবে অতটা সক্রিয় নই কিন্তু খাদ্যাভাসের বেলায় বেলায় একেবারেই অসচেতন। যতটুকু ভোগ করছি সে অনুপাতে সক্রিয় হচ্ছি কম। একদিকে এপিজেনেটিক্সের মাধ্যমে অল্টার্ড ফিজিওলজি, অন্যদিকে আমাদের অসচেতনতা…… পরিপ্রেক্ষিতে হতে পারে ভয়ংকর স্বাস্থ্য সংকট।
সচেতন হওয়ার এখনই সময়। অন্যথায় আপনিও কিন্তু এই স্বাস্থ্য সংকটের শিকার হতে যাচ্ছেন যা দক্ষিণ এশীয়দের প্রভাবিত করছে।