বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যের ধারাবাহিক ইতিহাস লিখতে বসলে ‘সমরেশ মজুমদার’ নামটিতে এসে কলম একটু থমকাতেই হবে। কারণ ১৯৬০ এর দশকের শেষদিকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের পর, সাহিত্যের আঙিনায় নতুন মুখ সেভাবে চোখে পড়েনি। বাংলা গদ্যসাহিত্য তখন পার করছিল নানামুখী চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক ঝঞ্ঝায় টালমাটাল পশ্চিমবঙ্গ। এমন পরিস্থিতিতে এক যুবকের লেখনী ভারতবর্ষে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করল।
সাতকাহন, গর্ভধারিণী, কালবেলাসহ অসংখ্য কালজয়ী উপন্যাসের লেখক সমরেশ মজুমদার নাকি লেখকই হতে চাননি! হতে চেয়েছিলেন অভিনেতা। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে এসেছিলেন এই লেখক। বাতিঘরে তাঁর নতুন বই ‘অপরিচিত জীবনযাপন’ প্রকাশ অনুষ্ঠানে নিজের লেখক হয়ে ওঠার গল্প শোনান সমরেশ।

জলপাইগুড়ির চা বাগানের ১৭ বছরের কিশোর তিনি। পড়াশোনার জন্য কলকাতা গেলেন। তখন কলকাতার আকর্ষণের কেন্দ্র ছিলেন উত্তম কুমার, সত্যজিৎ রায়। তাঁদের মতো হতে চাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সেই কিশোর ও তার বন্ধুরা মিলে নাটক করার সিদ্ধান্ত নিল। তৈরি করলো নাটকের দল। অনামি, অপরিচিত কিছু ছেলেমেয়ের নাটকের দল, তাই তাদের নাটকের দলকে বড় কোনও নাট্যকার নাটকের গল্প দিতেন না। কারণ লেখকরা মনে করতেন তাঁদের গল্প মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।

তাই একদিন ওই কিশোরের এক বন্ধু বললেন, তুই একটু চেষ্টা কর না। একটা গল্প লিখ। কিশোর বন্ধুদের কথায় গল্প লিখলেন। কিন্তু তাঁর বন্ধুরা পড়ে বললো, ‘নাটকের গল্প হয়নি। তোর দ্বারা নাটক হবে না।’ তখন ওই কিশোরের রাগ হলো। এরপর তাঁর আরেক বন্ধু বললো তুই আগে গল্পটা লিখ, তারপর নাট্যরূপ দে। আবার সে গল্প লিখলো। লিখে দলের সবার সামনে পড়লো। আবার সব বন্ধুরা বললো এভাবে নাটক হয় না।

তখন সে জিজ্ঞেস করলো কেন। বন্ধুরা বললো তাঁর নাটকের নায়ক ট্রেনে করে যাচ্ছে, সাঁতার কাটছে, এসব মঞ্চে দেখাবো কি করে। হবে না। তখন এক বন্ধু বললো, এই লেখা গল্পে রূপ দিয়ে কোনো পত্রিকায় পাঠা, ছাপিয়ে দেবে।
এভাবেই লেখা শুরু হয় দুই বাংলার জনপ্রিয় লেখক সমরেশ মজুমদারের। নাটকের গল্প না লিখতে পরলেও সমরেশ মজুমদারের লেখক হয়ে উঠতে আরও অনেক নাটকীয়তা পার করতে হয়েছে।

কালবেলা পেরিয়ে সেই লেখক এখন কালপুরুষের পথে। সমরেশ মজুমদারের পর আর কোনও সাহিত্যিকের কলম থেকে এতগুলো চরিত্র নেমে আসেনি, যাঁরা মধ্যবিত্ত বাঙালির, স্বপ্ন দেখতে চাওয়া বাঙালির, সব প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির, সব বেদনাবোধের শরিক হয়ে উঠেছিল।