জানুয়ারি ২০, ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএম
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৭০০ ডলারের সীমা ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে রুপার দামও সর্বকালের সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বাণিজ্য যুদ্ধের আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে আবারও স্বর্ণ ও রুপার দিকে ঝুঁকছেন।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্সে ৪ হাজার ৭২৬ দশমিক ৮৬ ডলারে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৭৩৭ দশমিক ১০ ডলারে পৌঁছায়।
এদিকে ফেব্রুয়ারি ডেলিভারির জন্য মার্কিন স্বর্ণের ফিউচার ৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্সে ৪ হাজার ৭৩২ দশমিক ৬০ ডলারে লেনদেন হয়েছে। একই সময়ে রুপার দাম শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্সে ৯৫ দশমিক ৩০৮ ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের রেকর্ড ৯৫ দশমিক ৪৮৮ ডলারের কাছাকাছি।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে বাণিজ্য যুদ্ধের শঙ্কা স্বর্ণ ও রুপার দাম বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১ ফেব্রুয়ারি থেকে আটটি ইউরোপীয় দেশের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন, যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ড কেনার অনুমতি দেওয়া হয়। এই অবস্থান বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে।
ইউবিএসের বিশ্লেষক জিওভান্নি স্টাউনোভো বলেন, অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি এবং সুদের হার কমানোর বিষয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের মতো নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দামকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ২০ দিনেই স্বর্ণের দাম বেড়েছে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। আর ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকে গত এক বছরে স্বর্ণের দাম বেড়েছে ৭০ শতাংশেরও বেশি। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, নীতি শিথিল হওয়ার প্রত্যাশা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যাপক স্বর্ণ কেনা এবং ইটিএফে বিনিয়োগ প্রবাহ এই উত্থানকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক ও নীতিগত অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণের মতো নিরাপদ সম্পদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পাশাপাশি কম সুদের হার অ-ফলনশীল সম্পদ ধরে রাখার ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
এদিকে ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর লিসা কুককে বরখাস্ত করার বিষয়ে ট্রাম্পের উদ্যোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে চলমান মামলার রায়ের দিকেও নজর রাখছেন বিনিয়োগকারীরা। এই রায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্বর্ণের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী ইউবিএস বিশ্লেষক জিওভান্নি স্টাউনোভো জানান, স্বর্ণের দাম আরও বাড়তে পারে এবং প্রতি আউন্সে ৫ হাজার ডলার স্পর্শ করতে পারে।
বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার প্রভাব দেশের বাজারেও পড়তে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। সংগঠনটির মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশীয় বাজারেও সমন্বয় করা হয়।
সবশেষ ১৯ জানুয়ারি রাতে স্বর্ণের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বাজুস। সেদিন ভরিতে ৪ হাজার ১৯৯ টাকা বাড়ানো হয়। নতুন দাম অনুযায়ী, দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৯ টাকায়, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
এ ছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৮ হাজার ৩১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ১ লাখ ৯৫ হাজার ৪৩০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৬০ হাজার ১৪৭ টাকা।
অন্যদিকে ২০২৫ সালে বিশ্ববাজারে রুপার দাম বেড়েছে ১৪৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে রুপাকে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং কাঠামোগত ঘাটতিকে এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত রুপার দাম বেড়েছে ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
উইজডমট্রির পণ্য কৌশলবিদ নীতেশ শাহ বলেন, স্বর্ণের মতো একই কারণ রুপার বাজারেও কাজ করছে, তবে নতুন সুযোগ তৈরির আগে কিছু ঝুঁকি রয়েছে, যা নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
এদিকে বিশ্ববাজারে স্পট প্লাটিনামের দাম ১ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্সে ৪ হাজার ৭৩২ দশমিক ৬০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্যালাডিয়ামের দাম শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে হয়েছে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৮৫৮ দশমিক ৯১ ডলার।