দাও ফিরে সে শিক্ষা, লও এ জিপিএ-৫

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

জানুয়ারি ২, ২০২১, ০২:১০ এএম

দাও ফিরে সে শিক্ষা, লও এ জিপিএ-৫

ক. সিরাজগঞ্জে আমাদের এক স্বজন। অভিজ্ঞ এবং মেধাবী স্কুলশিক্ষক তিনি। গত বছর তাকে একবার তার স্কুল পরিদর্শন করে ‘জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার’ কার্যালয়ের কর্তাব্যক্তিরা রীতিমতো ধমকান। ধমকানোর কারণটি ছিল, তিনি কেন কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ফেল মার্কস দিয়েছেন। তিনি সরল মনে তখন বলেছিলেন, তারা কোনোক্রমেই পাসের যোগ্য নয়। কিন্তু কর্তাব্যক্তিরা তাকে তখন ধমক দিয়ে বলেন, ‘আপনারা হান্ড্রেড পার্সেন্ট পাস দেবেন। নইলে আপনাদের খাতা দেখার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।’ শুনে তিনি আর আগে বাড়েননি।

খ. সাজ্জাদ হোসেন সাকিব। বাড়ি লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায়। উপজেলার সিন্দুর্ণা বিদ্যালয়ে পড়ত সে। তিন মাস আগে সপরিবারে হাতীবান্ধা ছেড়ে ঢাকায় গার্মেন্টে কাজ করছে সে। স্কুলের টেস্ট কিংবা প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা কোনোটিতেই অংশ নেয়নি। অথচ পরীক্ষার রেজাল্টে সে জিপিএ-৫ পেয়েছে। খবরটি বাংলাদেশ প্রতিদিনসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত হয়েছে ইতিমধ্যে। দ্বিতীয় ঘটনাটিকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ধরে নেওয়া যেত।

এত পরীক্ষার্থীর ভিড়ে এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতে পারত। কিন্তু প্রথম ঘটনার দিকে খেয়াল করলে আমরা আর দ্বিতীয় ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে মনে বা মেনে নিতে পারি না। প্রথম ঘটনার মতো ঘটনা আরও অনেক জায়গাতেই ঘটছে। খোদ শিক্ষকেরা এ অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন সময়ে। এর ফলে পরীক্ষা না দিয়েই বা পড়ালেখা না করেই ফটাফট জিপিএ-৫ পেয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশের ভবিষ্যতেরা। এই ‘মেঘ না চাইতেই জল’-এর মতো ফলাফল আমাদের যে একটি অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তার আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

বর্তমান সরকার বেশ কয়েক বছর আগে দেশে জাতীয় শিক্ষানীতি কার্যকর করে। অনেক আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষানীতিতে কিছু ভালো দিক রয়েছে। কিন্তু মূল্যবোধ, নৈতিকতা, সততা, ভদ্রতা, শিষ্টাচার শিক্ষানীতিতে ব্যর্থতা যথেষ্ট প্রকট। আর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যর্থতার কোনো জবাব নেই। এ নিয়ে অনেক অভিভাবক সংক্ষুব্ধ।

সাম্প্রতিক ফলাফল নিয়ে তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থী ছেলের ফলাফল নিয়ে বলেছেন, তিনি তাঁর সন্তানের জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে আনন্দিত নন! তিনি রীতিমতো শঙ্কিত। তিনি ভালো করেই জানেন তাঁর সন্তান ওই ফলাফল করার মতো পড়ালেখা করতে পারেনি। তিনি শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষায়, প্রজন্ম রক্ষায় ‘শিক্ষা ও শিশুরক্ষা মঞ্চ’ করারও ডাক দিয়েছেন।

একজন অভিভাবক সন্তানের সামান্য অর্জনেই যেখানে আপ্লুত হওয়ার কথা, সেখানে পরীক্ষার ভালো ফলাফলে সংক্ষুব্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার ভয়াল চিত্রই তিনি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চমাধ্যমিক শেষ করতেই একজন শিক্ষার্থীর চারটি পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। আর প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে প্রতিটি শ্রেণিতে অংশ নিতে হয় কমপক্ষে ছয়টি পর্বের স্কুলের পরীক্ষায়। একটি পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই আরেকটি পরীক্ষার সূচি আসে। পরীক্ষার এই বোঝা মাথায় নিয়ে ভীত হয়ে পড়ে শিশু শিক্ষার্থীরা। এর ফাঁকে ফাঁকে স্কুল কর্তৃপক্ষের চাপিয়ে দেওয়া মডেল টেস্ট নামের বাড়তি বোঝা তো আছেই।

২০০৯ সালে দেশে পিএসসি পরীক্ষা চালু হয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর এ পরীক্ষার আয়োজন করে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার এক মাসের মধ্যেই ফল প্রকাশ হয়। পঞ্চম শ্রেণির পাসের তিন বছর পার হলেই অংশ নিতে হয় জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায়। এ পরীক্ষাও ২০১০ সালে শুরু হয়। অষ্টম শ্রেণি পাসের দুই বছর পর এসএসসি এবং এর আরও দুই বছর পর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। এভাবে চারটি পাবলিক পরীক্ষা ছাড়াও স্কুলের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার চাপে দিশাহারা শিক্ষার্থীরা।

এত পরীক্ষার আয়োজনে অতিষ্ঠ অভিভাবকরাও। কোচিং ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে পুরোটা বছরই কাটছে ব্যস্ততায়। একটু বিশ্রাম নেই। সকালে স্কুলের কোচিং তো বিকালে অন্য এক শিক্ষকের কোচিং- এভাবেই কাটে সময়। অবসর বা খেলাধুলার সুযোগ নেই। পড়া মুখস্থ করানোর জন্য স্কুলে শিক্ষকের চাপ, বাসায় বাবা-মায়ের চাপ। সব মিলে শিশু হাঁপিয়ে ওঠে। তারা ভাবে, এ কোন পৃথিবীতে এসে পড়েছে তারা।

মনে পড়ে, আমরা যখন মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী ছিলাম, এসএসসি পরীক্ষাকে টার্গেট করে পরীক্ষা এলে ভীষণ রকমের নার্ভাস হয়ে পড়তাম। অথচ তখন ভয় কাটানোর মতোন বয়স অনেকটাই হয়ে গিয়েছিল আমাদের। আর এখন? এই খুদে শিক্ষার্থীরা, যাদের বয়স কি না ৮-১০ বছরের ঘরে। উপরন্তু তাদের কি না প্রশ্নফাঁসের মতো অনৈতিক একটি বিষয়ের সামনেও পড়তে হচ্ছে। যে শিশুশিক্ষার্থী এই অনৈতিকতার মধ্য দিয়ে বড় হচ্ছে, তার কাছ থেকে এই দেশ, এই রাষ্ট্র, এই সমাজ তথা এই পৃথিবী ভবিষ্যতে কী পাবে? সে কি গোড়া থেকেই দুর্বল শিকড় নিয়ে বেড়ে উঠবে না?

আমাদের এত বেশিসংখ্যক জিপিএ-৫ নামের হাইব্রিড পাস লাগবে না। আমাদের দরকার খাঁটি শিক্ষিত জাতি, যারা আমাদের কার্যত ভবিষ্যৎ হবে। শিকড়বিহীন ভবিষ্যৎ আমরা চাই না। শিশুদের রেহাই দিন। তাদের ভবিষ্যৎ বরবাদ করবেন না। শতভাগ পাসের কৃতিত্ব দেখাতে গিয়ে তাদের রাজনীতির বলির পাঁঠা বানাবেন না। পিএসসি-জেএসসি নামের আজগুবি পরীক্ষা বাতিল করুন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের এই বোঝা থেকে মুক্তি দিন।

এমনিতেই ওদের স্কুলের ব্যাগটা বইয়ের ভারে ভারী। ওই ভার আর বাড়িয়ে ওদের কুঁজো করে দেবেন না দয়া করে। ওদের হেসেখেলে পড়ালেখা করে বড় হতে দিন। ফলাফল কোনো বিষয় না। বড় হলে পরে ফলাফল নিয়ে ওরা ভাবতে পারবে। প্রকৃত শিক্ষালাভের সুযোগ দিন, এই জিপিএ-৫ এর ছড়াছড়ির ধুম বন্ধ করুন। 

Link copied!