সিটি এনজিওগ্রাম-এর অপব্যবহার: চিকিৎসায় অনৈতিক ব্যবসা

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক

জুলাই ৩০, ২০২১, ০২:৫২ এএম

সিটি এনজিওগ্রাম-এর অপব্যবহার: চিকিৎসায় অনৈতিক ব্যবসা

আজকে (২৯ জুলাই) একজন রোগীর করোনারী এনজিওগ্রাম করতে গিয়ে এক অদ্ভূত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। রোগী বাইরে থেকে করা সিটি করোনারী এনজিওগ্রামের রিপোর্ট নিয়ে আমাদের চিফ কার্ডিয়াক সার্জন ডা. লুৎফর রহমানের কাছে এসেছিলেন। রিপোর্টে দেখা যায় যে, হার্টের প্রধান তিন রক্তনালীতেই ব্লক আছে। রিপোর্ট দেখে সার্জনের সন্দেহ হলে তিনি এনজিওগ্রাম করবার জন্য রোগীকে আমার কাছে পাঠান। এনজিওগ্রাম করে দেখা গেল, হার্টের সব রক্তনালীই ভালো আছে! কোথাও কোন ব্লকও নেই। আমি সিটি এনজিওগ্রামের রিপোর্টটি আরেকবার দেখলাম। না, কোনোভাবেই মেলাতে পারলাম না! 

হৃদরোগ নির্ণয়ে সিটি এনজিওগ্রাম একটি অন্যতম আধুনিক পদ্ধতি। বিশেষ করে হার্টের জন্মগত ত্রুটি, হৃদপিণ্ডের অভ্যন্তরে অস্বাভাবিক ছিদ্র, ভাল্ভের অস্বাভাবিকতা, করোনারী রক্তনালীর অস্বাভাবিক উৎপত্তি, অল্পবয়সে করোনারী ধমনীতে ব্লক থাকার সম্ভাবনা প্রাথমিকভাবে সহজে নির্ণয়, বাইপাস সার্জারীর পরবর্তী সময়ে গ্রাফ্ট ভেসেলের সচলতা পরীক্ষা, হার্টে কৃত্রিম ভাল্ভ প্রতিস্থাপনের পরবর্তী সময়ে ভাল্ভের কার্যকারিতা পরীক্ষাসহ আরো কিছু ক্ষেত্রে সিটি স্ক্যান ও সিটি এনজিওগ্রামের ব্যবহার কার্ডিওলজিস্ট এবং কার্ডিয়াক সার্জনদের জন্য খুব উপকারী টুলস্।

কিন্তু সেটি হতে হবে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও প্রটোকল মেনে। চিকিৎসককে জানতে হবে তিনি সুনির্দিষ্ট কোন্ তথ্যটি চান। সেই তথ্যটি আর কোন সহজ উপায়ে, কম খরচে পাওয়া যাবে কিনা। সিটি এনজিওগ্রাম করতে গিয়ে এই গরীব দেশে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, যে পরিমাণ ক্ষতিকর রেডিয়েশন রোগীর দেহে প্রবেশ করবে, ব্যবহৃত কনট্রাস্ট মিডিয়া (এক ধরনের আয়নযুক্ত আয়োডিন তরল যা কিডনীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ) ব্যবহৃত হবে– সবকিছু হিসেবে নিয়ে যদি দেখা যায় যে, পরীক্ষাটিতে ঝুঁকির চেয়ে লাভ বেশি, তাহলে সেটি করতে কোন দোষ নেই। বরং রোগীর চিকিৎসা পদ্ধতি ঠিক করবার জন্য পরীক্ষাটি চিকিৎসককে বহুলাংশে সাহায্য করবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যিনি রিপোর্টটি করবেন তাঁর এই বিষয়ে উপযুক্ত জ্ঞান এবং প্রশিক্ষণ আছে কিনা— তা নিশ্চিত করা।

তবে বাস্তবতা দেখা যায় ভিন্ন। এক ধরনের আধাশিক্ষিত নৈতিকতাবর্জিত চিকিৎসক ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে যত্রতত্র যখন তখন সিটি এনজিওগ্রাম করার উপদেশ দিচ্ছেন। রোগীর কথা না শুনে, মনোযোগ দিয়ে রোগের ইতিহাস না জেনে, সহজলভ্য কম খরচের পরীক্ষা না করিয়ে এক লাফে সিটি এনজিওগ্রাম করার আদেশ দিচ্ছেন। এবং প্রায়শই এসবের ভিকটিম হচ্ছেন নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কমশিক্ষিত মানুষেরা। তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত চিকিৎসকদের উপর অল্পশিক্ষিত মানুষদের বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে এসব শিক্ষিত ‘দুর্বৃত্তরা’ মহান পেশার বদনাম করছেন।

যারা মানুষের দুর্দশা লাঘবে এই মহান পেশায় নিজেদের নিয়োজিত করেছেন তাঁদেরকে অবশ্যই এসবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। পাড়া মহল্লায় গজিয়ে ওঠা এসব ক্লিনিকগুলোর উপর সরকারী নজরদারী নিশ্চিত করতে হবে। ডাক্তারদের লাইসেন্স প্রদানকারী বিএমডিসিকে কার্যকর ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সমগ্র পেশাকে জনবান্ধব মানবিকতার পেশায় রূপান্তর করতে হবে।

জনগণের অবহতির জন্য বলছি– এই ধরনের অপচিকিৎসা আমাদের আশপাশের দেশগুলোতেও আছে। এরকম বহু প্রতারিত রোগীর সাক্ষাৎ আমার হয়েছে। তারা চিকিৎসা ট্যুরিজমের নামে বিভিন্ন দালাল নিয়োগ করে নিরীহ রোগীদের নিয়ে বাণিজ্য করছে। সুতরাং সবকিছু জেনে বুঝে আপনার সুচিকিৎসা যাতে দেশের মধ্যেই করতে পারেন সেই চেষ্টা করুন।

সবাই সুস্থ থাকুন।

লেখক: সিনিয়র কনসালটেন্ট। ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল।

Link copied!